Biplobi Barta

Monday, February 4, 2019

নাম মাত্র কর্মসুচি দিয়েই দায় সারছেন অনেক শ্রমিক সংগঠন


বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানাতে ৬৬১ টি বেসিক ইউনিয়ন এবং ৭২ টিরও বেশি ফেডারেশন আছে। বেশীর ভাগ ইউনিয়ন ও ফেডারেশন কারখানার মালিক ও সরকার অনুগত হওয়ার কারণে শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবী তুললেও দাবী আদায় না করেই শ্রমিকদের ঘরে ফিরতে হয়। এবারের গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধির আন্দোলনের দিকে তাকালেই তার প্রমান পাওয়া যাবে। তবে এবার শ্রমিকরা শ্রমিকনেতাদের অপেক্ষায় না থেকে তারা তাদের মত করে রাজপথে থেকেছে। গার্মেন্ট শ্রমিকরা ২০১৬ সাল থেকে নিম্নতম মজুরী ১৬,০০০ টাকার দাবীতে আন্দোলন করে আসছে। এই আন্দোলন করতে গিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটায়-নির্যাতন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছে। বিপ্লবী ধারার শ্রমিক সংগঠন গুল ছাড়া কোন শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায়নি। ২০১৬ সালের গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলনে সে সময় যেসব শ্রমিকনেতা গ্রেফতার হয়েছিলেন দু-একজন বাদে তারা আসলে শ্রমিকদের এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলেন, কেও কেও পুলিশকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন বাম্পন্থি শ্রমিক সংগঠন গুলকে কেন সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছিল। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের যে ভাবে মুখ বন্ধ করে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি করে রাখা হয়েছে তার জন্য কিছু শ্রমিক সংগঠন দায়ী। ২০১৮ সালে ১৪ জানুয়ারী নিম্নতম মজুরী বোর্ড গঠনের পর মোটামুটি প্রায় সব শ্রমিক সংগঠন ১৬,০০০ টাকা দাবী আদায় না পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন কিন্তু গত ১৪ সেপ্টেম্বর’২০১৮ তারিখ গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরী বেসিক ৪,১০০ টাকা, বাড়ী ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, খাদ্য ভাতা সহ নিম্নতম মজুরী ৮,০০০ টাকা খসড়া গেজেট প্রকাশ করার পর কারখানার মালিক ও সরকার অনুগত শ্রমিক সংগঠন গুল সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে নিম্নতম মজুরী ৮,০০০ টাকা শ্রমিকদের মেনে নেওয়ার কথা বলে তারা আন্দোলন থেকে সরে এসেছেন। বাম্পন্থি শ্রমিক সংগঠন গুল নিম্নতম মজুরী ১৬,০০০ টাকার দাবিতে ঢাকা প্রেসক্লাব কেন্দ্রীক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। যে কারখানা গুলতে বেসিক ইউনিয়ন যার মধ্যে বেসির ভাগ কারখানা বন্ধ আর যে কইটি কারখানা চালু আছে তাদের ট্রেড ইউনিয়ন এর যে বার্গেডিং সেই ক্ষমতা নেই। বাম্পন্থি শ্রমিক সংগঠন গুলর গার্মেন্ট কারখানা গুলতে তেমন একটা বেসিক ইউনিয়ন নেই, ইউনিয়ন করার উদ্যোগ নিলেও সরকার এবং গার্মেন্ট মালিকরা মিলে সেই ইউনিয়ন এর রেজিষ্ট্রেশন হইতে দেন না। বাম্পন্থি শ্রমিক সংগঠন গুলর কারখানা ভিত্তিক কমিটি, শিল্পাঞ্চলে ইউনিট কমিটি, আঞ্চলিক কমিটির মাধ্যেমে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ২০১৬ সালের পর থেকে জেলা পুলিশ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের কঠর ভূমিকার কারণে বাম্পন্থি শ্রমিক সংগঠন গুল কারখানা ভিত্তিক কমিটির কার্যক্রম চালাতে পারেনি যার কারণে শ্রমিকরা কারখানা ভিত্তিক সংগঠিত হতে পারেনি বলেই আজ শ্রমিক নেতারা শ্রমিক থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। মালিক-সরকার-শ্রমিক নেতাদের প্রতিশ্রুতি শুনছে না শ্রমিকরা। মালিক- সরকার ও শ্রমিক নেতাদের প্রতি শ্রমিকদের বিশ্বাস হারিয়েছে অনেকটা। গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গত ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে (নির্বাচন এর সময় কয়েকদিন বাদ দিয়ে) জানুয়ারি ২০১৯  টানা ২০ দিনেরও বেশি কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শেষে কাজে যোগ দেওয়ার পর সাভারের আশুলিয়া এলাকার বিভিন্ন কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক ছাটায়-মামলা-হামলার শিকার হয়েছে। বিক্ষোভের ঘটনায় সাভার-আশুলিয়া, উত্তরা, গাজীপুর এলাকার অন্তত ১৫/২০ কারখানায় ছাঁটাই করা হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক। অনেক কারখানার ফটকে চাকরিচ্যুত কর্মীদের ছবিসহ তালিকা টানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আন্দোলনের সময় ক্ষতিসাধনের অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়া, গাজীপুর, উত্তরা বিমান বন্দর থানায় বিভিন্ন কারখানার পক্ষ থেকে অন্তত ১২/১৫টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোয় আসামি করা হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিককে। এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক ও উত্তরা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি শ্রমিকনেতা জয়নাল আবেদীন, উত্তরা আঞ্চলিক নেতা মাসুদ, সাজুসহ ৪০/৫০ জন শ্রমিক। হাজার হাজার শ্রমিক গ্রেফতার অতংকে আছে।
অথচ আমরা দেখতে পেলাম ২০১৬ সাল থেকে যে শ্রমিক সংগঠন গুল ধারাবাহিক ভাবে আন্দোলন করে আসছিল তারা ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে জানুয়ারি ২০১৯ গার্মেন্ট শ্রমিকদের যে আন্দোলন সেই আন্দোলনে তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। অনেক শ্রমিক নেতারা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কারণে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। জানুয়ারি ২০১৯ এর প্রথম দিকে শ্রমিকরা যখন রাজপথে তখনো অনেক শ্রমিকনেতা নির্বাচনের কাজ শেষ করে ঢাকায় ফেরেনি। শ্রমিকদের এই আন্দোলনে শ্রমিকনেতারা যদি এই সময় শ্রমিকদের পাশে থাকতে পারতো তাহলে এই আন্দোলন সংগঠিত ভাবে হইতো এবং শ্রমিকদের বেতন আরো কিছুটা বাড়তো, শ্রমিকদের এই ভাবে ছাঁটায়-নির্যাতন হইতো না। বিভিন্ন কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক ছাটায়-মামলা-হামলার শিকার হওয়ার পরেও শ্রমিক সংগঠন গুলোর তেমন একটা ভূমিকা দেখতে পাচ্ছিনা। নাম মাত্র কর্মসুচি দিয়েই দায় সারছেন অনেক শ্রমিক সংগঠন।   

Saturday, December 8, 2018

নিউ টাউন কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকদের আইনানুগ পাওনা থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে।


গাজীপুর, কোনাবাড়ী অবস্থিত নিউ টাউন কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকদের তিন মাসের বকেয়া বেতন ও কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে শ্রমিকরা গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ তারিখ থেকে লাগাতার ভাবে বিভিন্ন কর্মসুচি চালিয়ে আসছে।তার মধ্যে শুকনো চিড়া-মুড়ি খেয়ে গত ৫ ডিসেম্বর বিকেএমইএ এর ঢাকা অফিসের সামনে অবস্থান করে।প্রচন্ড শিত উপেক্ষা করে সবাই গাদাগাদি করে খাওয়া দাওয়া না করেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি অফিসে রাত্রি যাপন করে।৬ ডিসেম্বর সকাল ৯ টা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসুচি পালন করেছে শ্রমিকেরা।৬ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান চলা কালীন বেলা ১১ টায় শ্রম প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ক্রাইসিস ম্যানেজম্যান্ট কোর কমিটির মিটিং করে একটি কমিটি করে দিয়েছেন, কমিটি ৭ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।
এই কারখানায় প্রায় ১৮০০ শ্রমিক কাজ করে যার বেশির ভাগী শ্রমিক নারী। এই কারখানায় শ্রমিকদের বেশীর ভাগ চাকুরীর বয়স ১০ বছরের বেশি, কারো কারো ২০ বছরের বেশি।শ্রমিকদের সাথে কথা বলে যানা যায়, এই কারখানার মালিক এই কারখানার লাভের টাকায় ভিয়েতনামে একটি কারখানা কিনেছেন। এদিকে এই কারখানার শ্রমিকরা পরিবার পরিবার পরিজন নিয়ে না খেতে পেয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে, বাচ্চাদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এক শ্রমিক অর্থের অভাবে আত্যহত্যা করেছেন।এই গার্মেন্ট মালিকের বাংলাদেশ থেকে ভিয়েতনামে টাকা পাচারের সাথে গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলম জড়িত।শ্রমিকদের ধারণা নিউ টাউন কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্ট কারখানার মালিক গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এর বাড়ীতেই আছেন।শ্রমিকরা যখনই বকেয়া বেতনের দাবী তুলেছে তখনই গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলম শ্রমিকদের হুমকি-ধামকি, ভয়ভীতি দেখিয়েছেন শ্রমিকদের এবং বিভিন্ন দালাল শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের মাঝে লেলিয়ে দিয়েছেন, শ্রমিকদের ম্যনেজ করার জন্য।একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ আসা করেনি শ্রমিকরা।শ্রমিকরা ভেবে ছিল গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলম শ্রমিকদের পাশে থেকে তাদের পাওনা আদায় করে দিবে কিন্তু তিনিই শ্রমিকদের বলেছেন তার পাওনা ৬ কোটি ১০ লক্ষ টাকা মালিকের কাছ থেকে আদায় করে দিতে।গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের এই আচরণ প্রমান করে যে শ্রমিকদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করার যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার সাথে গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলম জড়িত।
নিউ টাউন কোম্পানি লিমিটেড গার্মেন্ট কারখানায় প্রতি এক মাসে প্রায় ১৮০০ শ্রমিকের বেতন দিতে লাগে দুই কোটি টাকারও বেশি, তিন মাসে শুধু বকেয়া বেতন ৬ কোটি টাকারও বেশি লাগবে।আর যদি কারখানা স্থায়ী ভাবে বন্ধ করতে হয় তাহলে শ্রমিকদের আইনানুগ পাওনা দিতে আরো প্রায় ২০ কোটি টাকা লাগবে।তার মানে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকা লাগবে শ্রমিকদের সকল পাওনা পরিশোধ করে কারখানাটি স্থায়ী ভাবে বন্ধ করে দিতে।এই টাকা যাতে শ্রমিকদের না দেওয়া লাগে তার জন্য কারখানার মালিক বিভিন্ন ধরনের টাল বাহানা শুরু করেছে।যার সাথে কারখানার মালিক, গাজীপুরের বর্তমান মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, বিকেএমইএ, সরকারের কিছু লোকজন এবং কিছু দালাল শ্রমিক সংগঠন। মালিক পক্ষ মনে করেছিল সামনে নির্বাচনের ডামাডলে শ্রমিকেরা আন্দোলন করতে পারবেনা তাই শ্রমিকদের যেভাবে বোঝাবে সে ভাবেই বুঝবে, কিছু লাম-সাম পাওনা দিয়ে শ্রমিকদের বিদায় দিবে।কিন্তু শ্রমিকেরা সংগঠিত থাকার কারনে তারা তা পারছেনা।


লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু
সাংগঠনিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

Tuesday, December 4, 2018

গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত নিম্নতম মজুরী কিছুতেই শ্রমিকদের চাহিদা পূরণ হবেনা।



তৈরী পোশাক শিল্পের ঘোষিত নিম্নতম মজুরী শ্রমিকদের কিছুতেই পূরণ চাহিদা হবেনা না।গার্মেন্ট শ্রমিকদের যে কই টাকা বেতন বাড়লেও বাড়ছে বাড়ি ভাড়া, গাড়ী ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা খরচ ও চাউল, ডাউল, আটা, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম। তাই থমকে যাচ্ছে তাদের জীবন মান। অথচ বাংলাদেশে প্রস্তুতিকৃত পোশাক ইউরোপিয়ান দেশ জার্মানি, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড এবং স্পেনসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের রয়েছে অন্যতম অবস্থান। এছাড়া নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেট হিসেবে রপ্তানি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, জাপানসহ আরো কয়েকটি দেশেও।
 
দেশের ৪ হাজার ৪৮২টি গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছে প্রায় চার মিলিয়ন শ্রমজীবী মানুষ। সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ভোর থেকে গভীর রাতে রাস্তায় এভাবে ছুটে চলা শ্রমিকরা সেই প্রমাণই দেয় প্রতিদিন। ২০১৬-১৭ বছরের হিসেবে এই খাতে দেশের মোট রপ্তানি ছিলো প্রায় ৩৪ হাজার ৬৫৫ দশমিক নয়-দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মোট তৈরী পোশাক শিল্পের রপ্তানি করা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ১৪৯ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা মোট রপ্তানির প্রায় ৮১ দশমিক দুই তিন শতাংশ। যার সঙ্গে শ্রমিকরা সরাসরি জড়িয়ে আছে। 

অথচ কিছুতেই কাটছে না শ্রমিকদের অভাব-অনোটন ও বিভিন্ন সংকট। অপুষ্টিতে ভুগছে শ্রমিক ও তাদের সন্তানেরা। অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে শ্রমিকের সন্তানেরা। নারী শ্রমিকরা রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। হতাশায় অনেক শ্রমিক গার্মেন্ট কারখানা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দিনে দিনে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। শ্রমিকের বয়স ৩৫ পার হলেই সে কর্মঅক্ষম হয়ে পড়ছে।

ন্যূনতম মজুরির দাবিতে ঘণায়মান আন্দোলনের মুখে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫১ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করে ২৫ নভেম্বর'২০১৮ রোববার গেজেট জারি করেছে সরকার।
ন্যূনতম মজুরির গেজেট অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য সাতটি ও কর্মচারীদের জন্য চারটি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রমিকদের সপ্তম গ্রেডে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা, এরমধ্যে মূল মজুরি ৪ হাজার ১০০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ২ হাজার ৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৬০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৩৫০ টাকা, খাদ্য ভাতা ৯০০ টাকা। অপরদিকে প্রথম গ্রেডে মজুরি ১৭ হাজার ৫১০ টাকা।

শিক্ষানবিশ শ্রমিক মাসিক সর্বসাকুল্যে পাবেন ৫ হাজার ৯৭৫ টাকা, এরমধ্যে মূল মজুরি ২ হাজার ৭৫০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ১ হাজার ৩৭৫ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৬০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৩৫০ টাকা, খাদ্য ভাতা ৯০০ টাকা। । শিক্ষানবিশ কাল হবে ৩ মাস।

অপরদিকে পোশাক শিল্পের কর্মচারীদের চতুর্থ গ্রেডে ৮ হাজার ৩৭৫ টাকা ও প্রথম গ্রেডে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৭৫ টাকা। শিক্ষানবিশ কর্মচারী মাসিক সর্বসাকুল্যে পাবেন ৬ হাজার ১৬৪ টাকা। শিক্ষানবিশ কাল হবে ৬ মাস।

পোশাক শ্রমিকরা দ্বিতীয় গ্রেডে ১৪ হাজারে ৬৩০ টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ৯ হাজার ৫৯০ টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ৯ হাজার ২৪৫ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৮ হাজার ৮৫৫ টাকা ও ষষ্ঠ গ্রেডে ৮ হাজার ৪০৫ টাকা পাবেন।
কর্মচারীরা দ্বিতীয় গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা ও তৃতীয় গ্রেডে ১০ হাজার ৭৭৫ টাকা ন্যূনতম মজুরি পাবেন। তবে সব গ্রেডেই মূল মজুরি ও বাড়ি ভাড়া ভাতা ছাড়াও ন্যূনতম মোট মজুরির মধ্যে ৬০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৩৫০ টাকা যাতায়াত ভাতা ও ৯০০ টাকা খাদ্য ভাতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গেজেটে বলা হয়েছে, ন্যূনতম মজুরির কোন শ্রমিককে এই ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম মজুরি দেয়া যাবে না। তবে এই মজুরির চেয়ে বেশি হারে মজুরি দিলে তা কমানোও যাবে না। শ্রমিকরা প্রতি বছর মূল মজুরির ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন, মালিকরা এই সুবিধা দিতে বাধ্য থাকবে বলেও গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ৩০ নভেম্বর ২০১৮ ইং তারিখ পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি ছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা।

এই নিম্নতম মজুরী কাঠামো ১ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং তারিখ থেকে গার্মেন্ট শিল্পের সকল শ্রমিকদের জন্য কার্ষকর হওয়ার কথা। এই বেতন বৃদ্ধিকে শ্রমিকরা সমন্বয়ন বলছেন। এতে সুবিধা আর সুযোগের নাগাল পাচ্ছেন না তারা।

অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কথা বলে আরও কর ছাড় পেল পোশাক খাত, তৈরি পোশাক খাতের রফতানিকে উৎসাহিত করতে আরও কর ছাড় দিয়েছে সরকার। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে এ খাতের উৎসে কর কমানো হয়েছিল। দুই মাসের মাথায় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আবারও বড় ধরনের কর প্রণোদনা দেওয়া হলো। দিনে দিনে সুযোগ সুবিধা বাড়িয়েই নিচ্ছে গার্মেন্ট মালিকেরা। 

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, শতভাগ পোশাক শিল্পের জন্য এবার পরিবহন ব্যয়, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, সিকিউরিটি সার্ভিস, ল্যাবরেটরি টেস্টসহ নানা সেবায় মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ২ ডিসেম্বর ২০১৮, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বিষয়ে আদেশ জারি করে তা কার্যকর করেছে। এ ছাড়া পোশাক খাতের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বিলের ওপর ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম আরও শিথিল ও সহজ করা হয়।

এনবিআর বলেছে, এসব সেবার ওপর ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে পোশাক খাতের খরচ আরও কমবে, বাড়বে রফতানি আয়। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এতে সেবায় ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রে হয়রানি ও এ খাতের খরচ কমবে।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে পোশাক খাতের উৎসে কর ১ শতাংশ কমিয়ে দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে এ খাতের করপোরেট কর ১৫ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশ এবং যারা সবুজ শিল্প স্থাপন করবে, তাদের করপোরেট কর ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। দেশের মোট রফতানি আয়ের শতকরা ৮০ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২০ শতাংশ। এক ভ্যাট কমিশনার বলেন, এসব সেবা থেকে ভ্যাট তুলে নেওয়ার ফলে পোশাক খাতের উৎপাদন খরচ কমবে। এতে সামগ্রিকভাবে রফতানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জানা যায়, আগে পোশাক মালিকরা বন্দর থেকে ফ্যাক্টরিতে মালপত্র আনা-নেওয়ার জন্য পরিবহনের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতেন। এখন থেকে পরিবহন ব্যয়ে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। ফলে পোশাক খাতের পরিবহন ব্যয় কমবে। আগে পোশাক কারখানায় ইন্টারনেট ব্যবহার, অনলাইনসহ যে কোনো তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো। এনবিআর বলেছে, এখন থেকে পোশাক খাতে ব্যবহূত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে কোনো ধরনের ভ্যাট দিতে হবে না।
পোশাক পণ্য তৈরির জন্য বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল দেশ-বিদেশ থেকে কিনে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করতে হয়। এ পরীক্ষার জন্য পোশাক মালিকদের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হতো। এনবিআরের অদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবরেটরিতে যে কোনো কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য মালিকদের এখন আর ভ্যাট দিতে হবে না।

কিছু কারখানা মালিক শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য খরচ করে থাকেন। এতদিন বিনোদনের জন্য ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য ছিল। এখন থেকে পোশাক খাতের যে কোনো ধরনের বিনোদনকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু পোশাক কারখানার মালিকরা তাদের শ্রমিকদের কল্যাণে পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা, প্যান্ট ইত্যাদি সরবরাহ করে থাকেন। আগে এসব পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো। এখন আর দিতে হবে না।

অনেক পোশাক মালিক সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ করে থাকেন। এ নিরাপত্তা সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য ছিল। এনবিআরের নতুন আদেশে এ সেবার ওপর পুরোপুরি ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে। কোনো পোশাক প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে হলে জোগানদারের বিলের বিপরীতে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো। এখন জোগানদার সেবায় কোনো ভ্যাট লাগবে না।

বর্তমানে পোশাক কারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি (ওয়াসা সেবা) ইত্যাদি সেবা বাবদ যে বিল হয় তার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট মওকুফ সুবিধা রয়েছে। এনবিআর যে নিয়ম করেছে, তাতে বলা হয়েছে- রফতানিকারকরা সরাসরি এ সুবিধা পাবেন। এর জন্য ডেডো দপ্তরে যেতে হবে না।

বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে আত্মপ্রকাশ করতে দরকার মোট জিডিপি’র ৮ শতাংশ। যা পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই এখনই শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেয়া দরকার, তা না হলে এই শিল্প শ্রমিক সঙ্কটে পড়তে পারে।

লিখেছেনঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।