Biplobi Barta

Sunday, July 22, 2018

মালিকরা যেনতেন একটা মজুরি ঘোষণা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।



সাল
নিম্নতম মোট মজুরী
প্রতি বছর মজুরী বৃদ্ধির পরিমাণ
প্রতি বছর মজুরী বৃদ্ধি
সর্বশেষ নিম্নতম মোট মজুরীর পরিমাণ
২০১৩



,৩০০/=
২০১৪
,৩০০/=
০৫%
২৬৫/=
,৫৬৫/=
২০১৫
,৫৬৫/=
০৫%
২৭৮/=
,৮৪৩/=
২০১৬
,৮৪৩/=
০৫%
২৯২/=
,১৩৫/=
২০১৭
৬,১৩৫/=
০৫%
৩০৬/=
,৪৪২/=
২০১৮
৬,৪৪২/=
০৫%
৩২২/=
,৭৬৪/=
২০১৯
,৭৬৪/=
০৫%
৩৩৮/=
,১০২/=
বর্তমান মজুরী বোর্ডের সভায় মালিক প্রতিনিধি নিম্নতম মজুরী প্রস্তাবনা



৬ হাজার ৩৬০ টাকা
গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরী কমানোর প্রস্তাব



৭৪২ টাকা

 
মজুরী বোর্ডের সভায় মালিক প্রতিনিধি নিম্নতম মজুরী ৬ হাজার ৩৬০ টাকা প্রস্তাবনা করেছেন যাহা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক ও দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ শ্রমিকদের যেখানে মজুরী বাড়ানোর কথা সেখানে এই প্রস্তাবনার মধ্যদিয়ে ৭৪২ টাকা কমানো ষড়যন্ত্র বিজিএমইএ প্রমাণ করেছে যে, তারা সুষ্ঠ শিল্প মালিক নয়। তারা চরম শোষক ও নিপীড়ক, তাই এই অমানবিক প্রস্তাবনা পরিবর্তন করে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন শিল্পকে বিকাশিত করা ও জাতীয় অর্থনীতিক উন্নয়নের স্বার্থে নিম্নতম মোট মজুরী ১৬ হাজার টাকা মেনে নেয়ার আহবান জানাচ্ছি। এমনকি শ্রমিক প্রতিনিধি নিম্নতম মোট মজুরী ১২ হাজার ২০ টাকা যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে তাও বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিক প্রতিনিধি ইতিমধ্যেই বলেছেন যে, তিনি শুধু শ্রমিক সংগঠনের সাথেই যুক্ত তা নয় একই সাথে রাজনৈতিক দলেরও লোক। তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে প্রকারন্তরে শ্রমিকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মালিকদের স্বার্থ রক্ষার ফাদে পা দিয়েছেন। দেশের বর্তমান বাজার দরের সাথে মজুরীর প্রস্তাবনা কোনোভাবেই সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেখানে গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলে বস্তি বা টিনশেডের একটি রুমের ভাড়াই ৪-৫ হাজার টাকা দিতে হয়। সেখানে শ্রমিকদের খাদ্য, চিকিৎসা শিক্ষাসহ বেঁচে থাকার মত ন্যূনতম চাহিদা কিভাবে মিটাবে? আজ মজুরি বোর্ডের নির্ধারিত মিটিং-এ মালিক পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবনা করা হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মালিক সরকার মিলে মজুরি বৃদ্ধির নামে প্রহসন মঞ্চাস্থ করতে যাচ্ছেন।মালিকরা বাজার দর, আইএলও কনভেনশন, মুদ্রাস্ফীতি, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং শ্রমিকের জীবনমান কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে যে মজুরি প্রস্তাব করেছেন তা এদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকসহ সকল বিবেকবান মানুষ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন না। অন্যদিকে শ্রমিক প্রতিনিধি পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা শ্রমিকদের প্রাণের দাবি ১৬ হাজার টাকার বিষয়টি তোয়াক্কা না করে মালিকদের স্বার্থকেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। যা এদেশের প্রায় ৪০ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিক কোনোভাবেই মেনে নিবে না। মালিকরা যেনতেন একটা মজুরি ঘোষণা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সেই নীল নকশা বাস্তবায়নে তারা মিথ্যা মামলা দিয়ে গার্মেন্ট টিইউসি’র নেতৃবৃন্দকে দমন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মালিকদের কোন ষড়যন্ত্রই মজুরি আন্দোলনকে দমন করতে পারবে না।এমতাবস্থায় আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি যে, অবিলম্বে নিম্নতম মূল মজুরী ১০ হাজার টাকা আর মোট মজুরী ১৬ হাজার টাকা এবং একই হারে পিসরেটসহ সকল শ্রমিকদের মজুরী ঘোষণা করতে হবে। ১৬ হাজার টাকা মজুরীর দাবিতে আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

Tuesday, July 17, 2018

মজুরি বোর্ড এ উত্থাপিত প্রস্তাবনা গ্রহণযোগ্য নয়

শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়া প্রস্তাবিত ১২ হাজার ২০ টাকা মোট মজুরির মধ্যে মূল মজুরি ৭ হাজার ৫০ টাকা, মূল মজুরির ৪০ শতাংশ হিসেবে বাড়ি ভাড়া ২ হাজার ৮২০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৫০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ৬৫০ টাকা আছে। এ ছাড়া ৬ নম্বর গ্রেডে ১২ হাজার ৯৩০ টাকা, ৫ নম্বর গ্রেডে ১৩ হাজার ৯১০ টাকা, ৪ নম্বর গ্রেডে ১৪ হাজার ৯১০ টাকা, ৩ নম্বর গ্রেডে ১৬ হাজার ১৫০ টাকা, ২ নম্বর গ্রেডে ১৭ হাজার ৫৫০ টাকা এবং ১ নম্বর গ্রেডে ২১ হাজার ৫০ টাকা প্রস্তাব করেন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি।
 
এ ছাড়া পোশাক কারখানায় কর্মচারীদের জন্য সর্বনিম্ন ১১ হাজার ৯৫০ টাকা মজুরি প্রস্তাব করেন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়া। একই সঙ্গে মূল মজুরির ওপর প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব করেন তিনি। এ ছাড়া শ্রমিক ও কর্মচারী উভয়ের জন্য ২টি উৎসব ভাতা এবং মূল মজুরি ২০ শতাংশ হিসেবে বৈশাখী ভাতার প্রস্তাব করেন শ্রমিক প্রতিনিধি।

অন্যদিকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. সিদ্দিকুর রহমান পোশাক শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি ৬ হাজার ৩৬০ টাকা প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে মূল মজুরি ৩ হাজার ৬০০ টাকা, মূল মজুরির ৪০ শতাংশ হারে বাসা ভাড়া ১ হাজার ৪৪০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৩০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ২৪০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ৭৮০ টাকা। সব মিলিয়ে বর্তমানের চেয়ে ২০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে মালিকপক্ষ। তারা ৬ নম্বর গ্রেডের জন্য ৬ হাজার ৭৫২ টাকা ৫ নম্বর গ্রেডের জন্য ৭ হাজার ১৭৬ টাকা, ৪ নম্বর গ্রেডের জন্য ৭ হাজার ৬০৪ টাকা, ৩ নম্বর গ্রেডের জন্য ৭ হাজার ৯৮৩ টাকা প্রস্তাব করেছে। তবে ১ এবং ২ নম্বর গ্রেডের জন্য কোনো মজুরি প্রস্তাব করেনি মালিকপক্ষ।

মজুরি বোর্ড এ উত্থাপিত প্রস্তাবনা গ্রহণযোগ্য নয়, কারন সবাই অবগত ২০১৩ সালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরী বেসিক ৩,০০০ টাকা, গ্রস ৫,৩০০ টাকা নির্ধারণ করেছিল নিম্নতম মজুরী বোর্ড। তখন গার্মেন্ট শ্রমিকদের দাবি ছিল ৮,০০০ টাকা। ৫ বছর পর ২০১৮ সালে এসে গার্মেন্ট মালিকেরা মাত্র ৬০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি করতে চায়। মজুরি বোর্ড এ মালিকদের উত্থাপিত প্রস্তাবনা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, নিম্নতম মজুরী বোর্ড গঠন হওয়ার সময় আমরা সরকারকে বলেছিলাম "মজুরী বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধি শ্রমিকনেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিক প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হবে। অথচ আমরা দেখলাম গার্মেন্ট মালিকদের পছন্দ মত তাদের অনুগত শ্রমিক প্রতিনিধি নির্ধারণ করলেন। মজুরী বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি গার্মেন্ট মালিকদের কতটা অনুগত গতকাল ১৬ জুলাই নিম্নতম বেসিক ৭,০৫০, গ্রস ১২,০২০ টাকা প্রস্তাব করে তার প্রমান দিলেন, যেখানে গার্মেন্ট শ্রমিকেরা নিম্নতম মজুরী বেসিক ১০,০০০, গ্রস ১৬,০০০ টাকা দাবী জানিয়ে আসছে। তাহলে মজুরী বোর্ডে শামসুর নাহার ভুইয়া শ্রমিকদের প্রতিনিধি কিভাবে হল। মজুরী বোর্ডের এই নাটক গার্মেন্ট শ্রমিকেরা দেখতে চায়না। এই ধরনের নাটক গার্মেন্ট শিল্পের জন্য ভাল হবেনা। বর্তমানে গার্মেন্ট মালিকেরা যেমন ভাল থাকতে চায় তেমনি শ্রমিকেরাও একটু ভাল থাকতে চায়।
তাই মজুরী বোর্ডের এই নাটক বন্ধ করে অবিলম্বে গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য ১৬,০০০ টাকা নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করুণ।

লেখকঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, সাংগঠিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র । 

Sunday, July 1, 2018

সংবিধানের মূলনীতি-- তবু গণতন্ত্রকে আমরা খুঁজে বেড়াব

বাংলাদেশের মানচিত্র বারবার কাটাছেঁড়া হয়েছে। সাধারণ চলিত একটা কথা আছে: ‘লাশ ভাসা বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা’। তবে বারবার এই বিভাজনের দায় বাংলার জনসাধারণের নয়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের দুষ্টচক্রের ফলেই বারবার এই বিভাজন। ১৯০৫ সালে বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদ ঘটেছিল ইংরেজ শাসকদের উপনিবেশী স্বার্থে। ১৯৪৭-এর বিভাজন ছিল মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ভারতবর্ষে মুসলিম আর হিন্দু দুটি পৃথক জাতি, অখণ্ড ভারতে তারা একসঙ্গে থাকতে পারে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়েছিল ধর্ম-ভাষা-বর্ণ-বিত্তনির্বিশেষে ভারতবর্ষের প্রায় ২০ লাখ নিরীহ মানুষকে।
তবে আমরা সবাই জানি, সর্বশেষ যে বিভাজন, তাকে কেউ বিভাজন বলে না, মুক্তিযুদ্ধ বলে। এই বিভাজনের ফলে উপনিবেশী শোষণ উচ্ছেদ করে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক এক রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। প্রণয়ন করা হয় এক অনন্যসাধারণ সংবিধান। সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
নয় মাসের অবর্ণনীয় কষ্টের পর শুধু মুক্তি আর জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে কঠিন সময় পেরিয়ে যাওয়ার এত দৃঢ় মনোবল আর কখনো দেখিনি। তবু ঠিক এরই মাঝখানে থেকে যে বাংলাদেশ গঠন পেতে শুরু করে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের লাল টকটকে রক্তে স্নাত বাংলাদেশ, হাজার বছরের বাঙালির স্বপ্ন বাংলাদেশের যখন সত্যিই বাস্তবে রূপ পেতে থাকে মায়াহীন, স্বপ্নহীন বাস্তবের রুক্ষ-কঠিন জমি থেকে, তখন তার মধ্যেই দেখা দেয় যত্রতত্র চোরাবালি। সে কথা বলার লোক থাকলেও শোনার লোক ছিল না। কিংবা বলারও লোক ছিল না, শোনারও লোক ছিল না। এই অবস্থায় কোথাও এতটুকু দ্বিধা বা আপত্তি প্রকাশ করাটাও যেন একটা স্যাক্রিলেজ। তা যেন অসহ্য ঔদ্ধত্য, বিরক্তিকর বেয়াদপি। চিন্তা নয়, ভেসে যাওয়াটাই তখন বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধে পাওয়া শরতের নির্মল ভোরের সূর্যের মতো রক্তে ডোবানো বাংলাদেশ কি বিজয়ের পরদিন থেকেই পালাতে শুরু করেছিল? সে কি কেবলই পিছলে পিছলে সরে যাচ্ছিল? এ কথা বাহাত্তরের গোড়ায় যে বলতে পারে, এমনকি চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ-দুর্গতির দিনেও যে বলতে পারে, তাকে হঠকারীই বলা উচিত। বুকে থাপ্পড় মেরে গর্বের সঙ্গে ভাঙা দেয়ালের ওপর মোরগের মতো ডানা ঝাপটে বলা যায় বৈকি যে বাংলাদেশ তার যাত্রার শুরুতেই গণতন্ত্রের ধ্রুবপদ বেঁধে নিয়েছে। গণতন্ত্রের লড়াই আমরা কখনো থামাইনি এবং সেই লড়াই আজও চলছে। পাকিস্তানিরা ২৪ বছরের শাসনে আমাদের এক দিনের জন্যও গণতন্ত্র দেয়নি, পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই গণতন্ত্র তার নাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কোনো না কোনোভাবে সেনাবাহিনী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল একটানা, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানই যখন গোটা পাকিস্তান হয়ে গেল, তখনো তার গণতন্ত্র সহ্য হয়নি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ সম্বন্ধে কি বলা যাবে? মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে আসা বাংলাদেশ কেন বিজয়ের কমবেশি সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই পাকিস্তানি ঐতিহ্যই অনুসরণ করে বসল? আমাদের সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করল, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতাদের অতি নৃশংসভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। তবু নতুন শাসকদের কাছে তারা শাস্তি পেল না, পুরস্কারই পেল।
নব্বই সাল পর্যন্ত বুলেটঘেরা এই গণতন্ত্রের মধ্যে আমাদের কেটে গেল। লাতিন আমেরিকার নিষ্ঠুর স্বৈরতন্ত্র নয়, বাংলাদেশের মোলায়েম গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার। তারপর দেশের সম্পদ কবজা করা সেনাবাহিনী থেকে দলে দলে অবসরপ্রাপ্তরা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে আসেএসবই অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি! কিন্তু এখন যে তার চেয়েও বড় কথা দাঁড়িয়ে গেছে। নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও বছর চারেক তার
চর্চার পরপর আজ কারও কারও কাছে কি মনে হচ্ছে বর্তমান গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনায় স্বৈরাচার আরেকটু গণতান্ত্রিক ছিল? সর্বনাশ! গণতন্ত্র কি এখন দশদশায় এসে পৌঁছেছে?
এটা আমাদের গৌরবের কথাই বটে যে গণতন্ত্রকে আমরা কখনোই ফেলে দিতে পারিনি; কখনো ফেলে দেওয়া যাবেও না। রাষ্ট্রব্যবস্থায় কিছু ফল পেতে গেলে গণতন্ত্র থেকেই পেতে হবে, কিন্তু এই নির্মম সত্য কথাগুলোও মনে রাখা দরকার যে সবচেয়ে বড় আদর্শের স্লোগানগুলো গণতন্ত্রের মধ্যেই আউড়ে যাওয়া চলে, জনসাধারণের সর্বনাশ চালিয়ে যেতে যেতেও জনগণের ক্ষমতার কথা নিয়ে গলা ফাটানো যায়। সত্যিই গণতন্ত্রের মতো এমন নির্দোষ নিরাপদ সর্বধারক স্থিতিস্থাপক পাত্র আর কোথায় পাওয়া যাবে? গণতন্ত্রের মধ্যেই কেবল একাত্তরের ঘাতক মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা যায়, বাংলাদেশের মৌলিক অস্তিত্ববিরোধী অনুশোচনাশূন্য অতি নিকৃষ্ট যুদ্ধাপরাধীটিকেও রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা যায়, গণতন্ত্রের খাতিরেই মৌলবাদী উত্থানের সঙ্গে সহাবস্থান করা যায়, ভয়াবহ সন্ত্রাসকে গণতান্ত্রিকভাবেই জনগণের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া যায়। এক গণতন্ত্রেই কেবল ২৪ বছরের মধ্যে পাকিস্তানি কোটিপতিদের শূন্যস্থান মুক্তিযুদ্ধোত্তর হাজার হাজার কোটিপতিকে দিয়ে পূরণ করা যায়। শুধু গণতন্ত্রের সাহায্য নিয়েই বাংলাদেশকে মৃতের বাংলাদেশে পরিণত করা যায়। এত অনাহার, এত অশিক্ষা, এত দারিদ্র্য, এত নিরাময়হীন ক্যানসারে আক্রান্ত অব্যবস্থা গণতন্ত্রের বিশাল উদর ছাড়া আর কোথায় জায়গা পেতে পারত? তবু গণতন্ত্রকে ছাড়া যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মতোই গণতন্ত্রকেও আমরা খুঁজে বেড়াব। এ জন্যই গণতন্ত্রকে আমরা ফেলতে পারিনি, কিন্তু সমাজতন্ত্রকে ধরতে না ধরতে ছুড়ে ফেলে দিতে পেরেছি।
তড়িঘড়ি করে আমরা সমাজতন্ত্রের ইঞ্জিন চালিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা ইতিহাসে বিশ্বাস করি না। আমাদের কাছে কোনো কিছুরই পূর্বাপর নেই। আমরা রেডিমেড জিনিস বাজারে ছাড়ি, আবার রেডিমেড জিনিসই বাজার থেকে তুলে নিই। কেনই বা এককথায় সমাজতন্ত্র চালু, কেনই বা এককথায় সমাজতন্ত্রের বিদায়, তা কারও জানার উপায় নেই। জানানোর তোয়াক্কাও নেই। যে বিশ্বাস আর রাজনীতি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন, একেবারে তার বিপরীত প্রান্তে অবস্থান নিয়ে কী করে তাঁর আদর্শেই চলছি বলা যেতে পারে, তা নিয়ে যেহেতু জিজ্ঞাসা নেই, কাজেই উত্তরও নেই। একটা চরম সুবিধাবাদী কথা ‘রাজনীতিতে শেষ কথা নেই’এটাই হতে পারে একমাত্র উত্তর। সমাজতন্ত্রকে বিদায় জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তার যে একটা মূল কথামানুষের সঙ্গে মানুষের ভয়ানক বৈষম্য রাখা যাবে না, এ কথাটারও দায় থেকে মুক্তি পেতে গণতন্ত্রকে এখন অবাধ করা গেছে। পর্বতপ্রমাণ ধনসংগ্রহ, আকাশচুম্বী বিষমতা এখন সমাজের মধ্যে সত্যিই অবাধ। এটা যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী না হয়, তাহলে কী যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, তা আমার জানা নেই।
খুবই ভালো হয়েছে, ১৯৭৫-এর পর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছিবড়ের মতো দূর-দূর করে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো, পাকিস্তানপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে পথের কাঁটা আর কী হতে পারে? নিজেদের বিবেচনাকে আমাদের ধন্যবাদ জানাতে হয় এ জন্য যে দুষ্ট লোকে ধর্মনিরপেক্ষতার যে মানে করে, অর্থাৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্ম-বিবেচনা কোনো ভূমিকা নেবে না, ব্যক্তির ধর্মাচরণে রাষ্ট্র কখনোই হস্তক্ষেপ করবে না এবং ধর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি অনাগ্রহী, উদাসীন থাকবে, শুধু এই ছাড়া যে রাষ্ট্র কারও ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ সহ্য করবে নাসেখানে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ দাঁড়াল সব ধর্মের পোষকতা করা। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের ভূরিপরিমাণ পোষকতা করা। এই পোষকতায় সত্যি সত্যিই ধর্মের পোষকতা হয়েছে কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কিন্তু এই পোষকতাকে যে ধনসম্পত্তি সংগ্রহ ও লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সমাজে ধনবান ও শক্তিমানদের প্রচুর কাজে আসছে, তাতে সন্দেহ নেই। দেখা যায়, রাষ্ট্রের ধর্মপোষকতার সঙ্গে ধর্মের বিন্দুমাত্র যোগ নেই, যোগ আছে লুটের। লুটের স্বার্থেই সমাজ ও রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটাতে হয়।
বাকি রইল আরেকটি স্তম্ভজাতীয়তাবাদ। ইতিহাসের পথ প্যাঁচালো। ইতিহাসে জাতীয়তাবাদের পথও প্যাঁচালো। অবিকল দুটি এক রকম জাতীয়তাবাদ কখনো দেখা যায়নি। উগ্র, অত্যুগ্র যে বিশেষণই লাগানো হোক না কেন, জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব বহুবর্ণিলই বটে। আমার ধারণা, বাঙালি হওয়ার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের খুবই প্রয়োজন ছিল। ওই তত্ত্ব দিয়েই আমরা পাকিস্তানি শোষণের চেহারাটা বোঝাতে পেরেছিলাম।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিজস্ব তাত্ত্বিক ব্যবহার কেমন হতে পারে, আমার জানা নেই। কিন্তু প্রবল প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনে-সংগ্রামে তার কী ইতিবাচক ভূমিকা থাকতে পারে, তা আমরা সবাই জানি। কাজেই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বলতে, এমনকি একটা সাবানের বুদ্বুদ বিদ্যমান না থাকলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পাকিস্তানিরা যা বলতে পারত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঠিক তা-ই। পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল না। কারণ, বাংলাদেশই ছিল না, কিন্তু ‘পাক-বাংলার কালচার’, ‘ইসলামাইজেশন’, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’ ইত্যাদি লব্জ তখনো ছিল, যদিও পশ্চিম পাকিস্তানে চার-চারটি জাতি থাকার ফলে পাকিস্তানিরা এ বিষয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করেনি। কিন্তু এখন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে শোরগোল তোলার লোকের অভাব নেই। আমার ধারণা, বাংলাদেশকে একটি সতেজ স্বাস্থে্যর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিতে পারলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটু ক্রুদ্ধ, একটু অসহিষ্ণু ভূমিকার ইতি ঘটত।
বাংলাদেশের এখন স্বাভাবিক বাঙালি হওয়ার রাস্তা নেই, বাঙালি বলতে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে। স্বাভাবিক বাঙালিকে স্বাভাবিকের পথ থেকে সরিয়ে এনে উদ্ভট এক মানুষ বানিয়ে তোলার জন্যই তুলে ধরা হচ্ছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। স্বাভাবিকের পথটাকে খোলা রাখার জন্যই প্রয়োজন বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
বাংলাদেশ-গভীর অন্ধকারে তার ভাঙনের শব্দ, ধস নামার গম্ভীর ধুপধাপ আওয়াজ; ধস নামছে বিক্রমপুরে, ঢাকায়, মানিকগঞ্জে, তিতাসের তীরে, কর্ণফুলীতে, সিলেটে সুরমায়, টাঙ্গাইলে, ভূঞাপুরে, গাইবান্ধায়, তিস্তার পাড়ে, রংপুরে, যমুনায়, সিরাজগঞ্জেঅন্ধকারে, ক্রমাগত ধস নামছে, ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশ, অন্ধকারে, বাতাসের ঝড়ের ঝাপটে জাহাজ ডুবে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যায়, ঢাকার সবচেয়ে দীর্ঘ দালানের চূড়াটি অদৃশ্য হচ্ছে আর ওদিকে উজাড় হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন, চিংড়ি-ডলারের জন্য বন্দুকের নির্দেশে লোনাপানি উঁচু হয়ে আসে, খালপাড়ে রক্তের লবণ লাল টকটকে হয়ে ছড়িয়ে যায়, সব সুন্দরী, গেউয়া মরে যায়, মুমূর্ষু কুকুরের মতো বেঙ্গল টাইগার কেঁউ কেঁউ করে ডাকে, আবার উত্তরের মাটির নিচ থেকে পানি সরে যায়, বিশাল বিশাল ফাটল দেখা দেয় প্রসূতি বাংলাদেশের তলপেটে, বাংলাদেশের মাটির এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত, মাটির ওপরে ক্রমাগত বালিয়াড়ি এগিয়ে আসে। এই সব, এই সব কি বীভৎস বর্ণনা, না বীভৎস বাস্তব!

কাকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে এই যন্ত্রণা?

(২৬ জুন ২০১৮ তারিখে দেওয়া ‘১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ শীর্ষক জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতার সংক্ষেপিত রূপ) 
লেখকঃ  হাসান আজিজুল হক, কথাসাহিত্যিক; সাবেক অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
০১ জুলাই ২০১৮ ইং তারিখ প্রকাশিত প্রথম আলো প্রত্রিকা থেকে নেওয়া

Saturday, June 23, 2018

সেই চিরচেনা কর্মব্যস্ত শিল্পাঞ্চল, সেখানেই আমার ঠিকানা

 গার্মেন্ট শ্রমিকরা বছরে দুই বারের বেশি গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ সাধারনত পায় না। দুই ঈদেই সাধারনত পরিবার পরিজনদের সাথে দেখা সাক্ষাত থেকে শুরু করে আনন্দ কষ্ট গুলো ভাগাভাগি করার সুযোগ পান এই শ্রমিকরা। যে দিনগুলির জন্যে পুরো বছর ধরে অপেক্ষা আর প্রতিক্ষা সে দিনের সমাপ্তি হয় দুই ঈদে। যে গার্মেন্টসের জন্য পরিবার প্রিয়জন আর আত্বীয়স্বজন সবার সাথে হৃদয়ের সকল সংযোগ গুলি প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে, সেখানে বছর পর ঈদ উপলক্ষে ছুটি তাও আবার তিন বা চার দিন! যার অনেকের ক্ষেত্রেই যেতে একদিন আসতে একদিন আর পরিবার-প্রিয়জনদের সাথে এক বা দুই দিন। বহু প্রতিক্ষিত সেই দিন গুলি নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথেই যেন শুরু হয় নতুন এক সংগ্রাম। এ সংগ্রাম নিজের জীবনের বিনিময়ে দুই-তিনটা দিন ছুটি বাড়িয়ে নেওয়ার সংগ্রাম। ঈদ উপলক্ষ্যটি নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথেই মালিক পক্ষক, শ্রমিকদের প্রিয়জনদের প্রতি দূর্বলতার এ সুযোগকে পুঁজি করে শ্রকিদের সাথে প্রতারনার এক খেলায় মেতে ওঠেন মালিক পক্ষ। ছুটি বাড়িয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওভার টাইম ছাড়া কাজ করিয়ে নেওয়া হয় ছুটির দিন বা শুক্রবার গুলিতে। এতো অভিযোগ এতো কষ্ট গার্মেন্ট শ্রমিকদের তবুও ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরা । গার্মেন্ট মালিকদের পাথরের মন একটু কোমল করে দেন আর তারা যেন সাত থেকে দশ দিন ছুটির ব্যবস্থা করে দেন, শ্রমিকরা মনে মনে এই কামনা করে। ঈদের ছুটির সাথে সমন্বয় করা হবে বলে শুক্রবার আর সরকারী ছুটির দিন গুলিতে ওভারটাইম ছাড়া দিব্যি কাজ করিয়ে নিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। ৪-৫টা শুক্রবার কাজ করে আনন্দের জোয়ারে মন ভাষান পোশাক শ্রকিরা। এক এক করে গুনে হিসাব করে বের করেন তারা ঈদে ছুটি পাচ্ছেন দশ দিন । অনেক গার্মেন্ট আবার বেতন বোনাস নাদিয়েই পালিয়ে যান, অনেক গার্মেন্ট আবার সুযোগ বুঝে শ্রমিক ছাটায় করেন, কোন কোন গার্মেন্টে ঈদের বোনাস দেন না, অনেক কারখানায় বোনাস দিলেও তা যৎসামান্য তবুও সবাই প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় মালামাল গুছিয়ে নিয়ে, সাধ্যমত হয়তো চেষ্টা করেছেন প্রিয়জনদের জন্য রাস্তার পাশে গড়েওঠা দোকান গুল থেকে কিছু কিনতে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা/১০টা পর্যন্ত কাজ করা রুগ্ন শরীর নিয়ে পরিবার পরিজনের সাথে দেখা করার জন্য গ্রামের বাড়ীর পথে পা বাড়ায় এই পোশাক শ্রমিকরা। সামনে তাদের যত বাধা সব জয় করতে হবে এই জীর্ণ আর রুগ্ন শরীরেই। কারখানা থেকে বের হওয়ার পর তাদের জানা নেই কোন পথে কিভাবে কোন যানবাহনেই বা প্রিয় মানুষগুলোর কাছে ফিরবেন তারা। বাস বা ট্রেনের ছাদে কেউবা ট্রাকে বা লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে যাত্রা শুরু করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পুরো পথ পাড়ি দিয়ে হয়তো ঈদের দিনের ২/১ ঘন্টা পূর্বে পৌঁছান গ্রামের বাড়িতে। কেওবা গ্রামে গিয়ে নতুন বিয়ে করেন কেও তার ছোট বোনটাকে সাথে করে নিয়ে আসেন গার্মেন্টে চাকুরী করানোর জন্য ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি শেষ না হতেই এরই মধ্যে সুতোয় টান পড়ে, ফিরতে হবে গার্মেন্টসে! আবার সেই কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি শুরু। আবারও একটা জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরতে হবে চিরচেনা সেই গার্মেন্টে, সেলাই মেসিন, সুপারভাইজার, চিরচেনা বকাবকি তবুও ফিরতে হবে। অশ্রুসজল প্রিয় বাবা-মা, অতি আদরের প্রিয় সন্তান বিদায়!!! দেখা হবে আবার আগামী ঈদে.........
আসা-যাওয়ার এই পথে যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে তবে কেউ হয়তো চিরতরে পঙ্গু বা মহামূল্যবান জীবটাই হারিয়ে ফেলেন। বিদ্ধস্থ হয় পরিবার! আমরা হারায় সহকর্মী! আর তো কারও কিছু যায় আসে না......!!! না মালিকের, না সরকারের, সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়, হয় নিজেকে, না হয় পরিবার গুলকে এটায় জীবন তবুও থেমে থাকার নই গার্মেন্ট শ্রমিকদের জীবন যুদ্ধ
লেখকঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Monday, June 11, 2018

মজুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকায় নারী শ্রমিক তার শরীরের নিয়ন্ত্রণও হারাচ্ছে


গত শতাব্দীর ’৮০-র দশক থেকে শুরু হওয়া গার্মেন্ট শিল্পের রাতারাতি এতটাই বিকাশ হয় যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গার্মেন্ট শিল্প গড়ে উঠেছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএএর সূত্র মতে তাদের তালিকাভুক্ত গার্মেন্টসের সংখ্যাই প্রায় ১০ হাজার’ এরও বেশি। তাতে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। ছোট-বড় মিলিয়ে আরো অনেক বেশি গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এই শ্রমিকদের শতকরা ৮৫ জনই হচ্ছেন নারী শ্রমিক । সাম্রাজ্যবাদের সস্তা শ্রম লুণ্ঠন এবং মালিকদের অতি মুনাফা অর্জনের যাঁতাকলে শ্রমিকরা পিষ্ট হচ্ছেন। রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শতকরা ৭৬ ভাগ আসে এই গার্মেন্টস শিল্প থেকে। কিন্তু শ্রমিকদের জীবন চলে নির্মম দুর্বিসহ অবস্থায়। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় শ্রমিকদের দৈন্যদশা পৃথিবীর দেশে দেশে থাকলেও বাংলাদেশের শ্রমিকদের, বিশেষতঃ গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিকরা প্রায় মধ্যযুগীয় দাস প্রথার মধ্যেই রয়ে গেছেন। বুর্জোয়াদের দ্বারা স্বীকৃত আইনও গার্মেন্টস মালিকরা মানছে না। বুর্জোয়া আইনের সুবিধাগুলো থেকেও গার্মেন্টস শ্রমিকরা বঞ্চিত। তারা বেতন-ভাতা ঠিকমত পাচ্ছেন না। ২৪ নভেম্বর, ’১২-এ আগুনে পুড়ে নিহত-আহত তাজরীন গার্মেন্টের শ্রমিকদের ৩ মাসের বেতন-ওভার টাইম বকেয়া ছিল, দিব, দিচ্ছি বলে টালবাহানা করছিল। ২৪ নভেম্বরের পর টানা ১০ দিন আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিজিএমইএ শ্রমিকের বেতন-ভাতা দিয়েছে। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালে রানা প্লাজায় ১১৩৮ জন শ্রমিক ভবন ধ্বসে নিহত হয় এবং ২৪৩৮ জন শ্রমিক গুরুত্বর ভাবে আহত হয় ২০১০ সালের ১০ ডিসেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর অবস্থিত হামিম গার্মেন্টে আগুনে পুড়ে ৩৩ জন শ্রমিক নিহত হয়, তাদের পরিবার গুল ৩ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরন পেয়েছে ২০০৫ সালে আশুলিয়ার পলাশবাড়ীতে অবস্থিত স্পেক্টাম গার্মেন্টে ভবন ধ্বসে ৬৩ জন শ্রমিক নিহত হয় এবং অনেক শ্রমিক আহত হয়, নিহত শ্রমিকের পরিবার মাত্র ৬০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরন পেলেও আহত শ্রমিকরা কোন ক্ষতিপূরন পায়নাই আরো অনেক গার্মেন্টস কারখানাতে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক আহত হয়ে পঙ্গুত জীবন যাপন করছে নিহত-আহত শ্রমিকদের বেশির ভাগ নারী শ্রমিক এসব কারখানায়  অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিজিএমইএ শ্রমিকের সুধু মাত্র বকেয়া বেতন-ভাতা দিয়েছে। বর্তমানে অনেক কারখানায় এই শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটি, মেডিক্যাল ছুটি দেয়া হয় না। অসুস্থতাজনিত বা অন্য কোন অনিবার্য কারণে একদিন হাজির না থাকলেও বেতন কেটে নেয় এবং হাজির না থাকার কারণে বেতন আটকে রাখে, অনেক ক্ষেত্রে চাকুরী হারাতে হয় অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ দেয়া হয় না। অনেক কারখানায় নিয়গ পত্র, পরিচয় পত্র দেওয়া হয়না বিশেষ কোনো কারণে কোনো শ্রমিক পরপর কয়েকদিন হাজির না থাকলে ছাঁটাই করে অথবা নতুন করে নিয়োগ দেয়, যাতে পুরনো শ্রমিকের সুবিধা (ঈদ বোনাস ইত্যাদি) ভোগ করতে না পারে। রাত ৮/১০/১২টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হলেও খাতায় হাজিরা তোলে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। এটা করে বিদেশী বায়ারদের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্য। বাস্তবে বিদেশী বায়াররাও যে এই ফাঁকিবাজী জানে না বা বোঝে না তা নয়। দেশী বিদেশী মিলেই তারা এভাবে আইনমেনে’ চলে। মালিকদের ইচ্ছা-খুশিমত ছাঁটাই করে, ছাঁটাই করার সময় পাওনা বেতন-ভাতা দেয়া হয় না। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হয় না অধিকাংশ গার্মেন্টসে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করে আদায় করতে হয়। অনেক কারখনাতে প্রসবকালীন তাদের চাকরী হারাতে হয়। আবার অধিকাংশ কারখানায় সন্তান প্রতিপালনের জন্য কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার নেই, যেখানে আছে সেখানে প্রয়োজনীয় এর তুলনায় অনেক কম বাচ্চা রাখা হয়, আবার এক বছরের নিচের বাচ্চাদের রাখা হয়না, যার কারণে নারী শ্রমিকরা বাচ্চা লালন পালনের জন্য চাকুরী ছাড়তে বাধ্য হয়।
৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের স্বীকৃতি থাকলেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের শ্রম দিতে হয় দৈনিক ১২/১৪/১৬ ঘণ্টা। এ ছাড়া হোল নাইটও করতে হয় বাধ্যতামূলক। ওভার টাইম মজুরী দ্বিগুণ করার আইন থাকলেও তা অনেক কারখানায় দেওয়া দেয়া হয় না, ওভার টাইমের ঘন্টা মাস শেষে কেটে নেওয়া হয়।
মালিকরা শ্রমিক শোষণ করে টাকার পাহাড় গড়লেও গার্মেন্টসে শ্রমিকদের জন্য কোনো সুব্যবস্থা নেই। ভাত খাওয়ার ভাল কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক গার্মেন্টসে ছাদে বা সিঁড়িতে বসে খেতে হয়। ডিউটি শেষে নারী শ্রমিকদের অসম্মানজনকভাবে চেক করা হয়। শ্রমিকদের কারখানার প্রত্যেক তলায় অনেক কারখানায় কলাপসিবল গেটে তালাবন্ধ করে রাখা হয়। ছোট ছোট অনেক কারখানায় জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকার কারণে অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রাতেই ঘটে থাকে। রাতে আগুন লাগা, গেট বন্ধ থাকা, অপ্রশস্থ সিঁড়ি, খরচ বাঁচানোর জন্য দুর্বল বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে, অর্থাৎ অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রায় ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং বহু শ্রমিক আগুনে পুড়ে আহত-নিহত হন। মনে হয় যেন, মালিক এবং সরকারের এর জন্য কোনো দায় নেই। ভবন ধ্বসে, আগুনে পুড়ে হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হলেও এ পর্যন্ত কোনো মালিকের শাস্তি পেতে হয়নি।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আর্ন্তজাতিক বাজারে বাংলাদেশে গার্মেন্টস্ শিল্পের যে নেগেটিভ ইম্প্রেসনস্ হয়েছিল তা এখন অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। এই ঘটনা হবার কারনে বাংলাদেশের গার্মেন্টস্ শিল্প অনেক চেঞ্জ হয়েছে । এটি ছিল গার্মেন্টস্ সেক্টরের একটি টার্নিং পয়েন্ট গার্মেন্টস্ ম্যানুফেকচারারর্স থেকে শুরু করে গার্মেন্টস্ মালিকরা এখন অনেক সতর্কতা পালন করছেন বায়ারদের কনফিডেন্টস্ এখন অনেক বেড়ে গেছে । বিশেষ করে কোম্পানিগুলোতে একর্ড-এলাইন্স এর আওতাভূক্ত থাকার কারণে এবং কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কিছুটা একটিভ থাকার কারণে শ্রমিকদের কিছুটা নিরাপত্তা বেড়েছে
চার দশকে দেশের পোশাক শিল্পের উন্নতি অন্য রকম। ৪০ হাজার ডলারের রফতানি আয় পৌঁছেছে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারে। স্ফীত হয়েছে মালিকদের সম্পদ। এর সবটাই সম্ভব করেছে সস্তা শ্রম। এ শিল্পের ভরসার জায়গাও এখনো নিম্ন মজুরিই। কয়েক দফা বেড়ে ৫ হাজার ৩০০ (৬৬ দশমিক ৮৮ ডলার) টাকায় পৌঁছেছে শ্রমিকদের নিম্নতম মাসিক মজুরি। তারপরও তা এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মজুরির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কম্বোডিয়ায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৪০ ডলার। ভিয়েতনামে এ মজুরি প্রায় ১৪৭ ডলার, ফিলিপাইনে ২০২, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৬০, মালয়েশিয়ায় ২২৩, থাইল্যান্ডে ২৬৫, চীনে ২৩৪ ও মিয়ানমারে ৮০ ডলার। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতে নিম্নতম মাসিক মজুরি প্রায় ১৪৪ ডলার, পাকিস্তানে ১০৬, শ্রীলংকায় প্রায় ৬৯, নেপালে ৭৪ ও আফগানিস্তানে ৭৩ ডলার।

তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশের বিদ্যমান এ মজুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না। দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত পোশাক শিল্পে ১৯৮৫ সালে নিম্নতম মজুরি ছিল ৫৪২ টাকা। ১৯৯৪ সালে এটি বাড়িয়ে ৯৩০ টাকা করা হয়। এর এক যুগ পর ২০০৬ সালে মজুরি বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৬৬২ টাকা। এর পর ২০১০ সালে নিম্নতম মজুরি বেড়ে হয় ৩ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০১৩ সালে নিম্নতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে মজুরি কমিশন। তবে মজুরি বৃদ্ধির জন্য প্রতিবারই আন্দোলন করতে হয়েছে শ্রমিকদের। অনেকটা নিয়ম মেনেই মজুরি বৃদ্ধিতে অনীহা দেখিয়েছেন শিল্প মালিকরা।
পোশাক শিল্পে কর্মরতদের মধ্যে একটি বড় অংশ নিম্নহারে মজুরি পায় না। এ খাতের ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিকের মজুরি ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে ৭০ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক ৫-৭ হাজার টাকা মজুরি পান। নারী পুরুষের মজুরী বৈষম্য দুর হয়নি
সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে শ্রমশক্তি দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের উৎপাদন, নির্মাণ, কৃষি ও মত্স্য খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম গড় মজুরি ৮ হাজার ৮৪৬ টাকা।
দেশের খাতভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিপুল জনগোষ্ঠী আমাদের দেশের জন্য সম্পদ। তবে এখানে বৈষম্যপূর্ণ মজুরি কাঠামো বিদ্যমান। বৈষম্যমূলক এ মজুরি কাঠামোর ফলে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও শ্রমের ক্ষেত্রে এক ধরনের এক্সপ্লয়টেশন রয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তবে সদিচ্ছার অভাবে সেটি হচ্ছে না।
জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (ইউএন-এসকাপ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে শ্রম উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্থানে। বাংলাদেশে শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা বছরে মাত্র ৮ হাজার ডলার। এর চেয়ে কম শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা রয়েছে শুধু কম্বোডিয়ায়। দেশটির শ্রমিকদের গড় উৎপাদনশীলতা ৬ হাজার ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ১৪তম, পাকিস্তান ২০ ও ভারত ২২তম স্থানে রয়েছে। দেশ তিনটির শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা যথাক্রমে ২৩ হাজার, ১৮ হাজার ও ১৫ হাজার ডলার।
সংস্থাটি তথ্য বলছে, শ্রমের মজুরির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। নিম্ন উৎপাদনশীলতার এটি অন্যতম কারণ। এজন্য বিভিন্ন খাতে মজুরি বাড়ানোর প্রতি নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত উপকরণ তথা শ্রমের দক্ষ ব্যবহারের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে। কারণ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেশি হলে অধিক বিনিয়োগ ও অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া ব্যবহূত উপকরণগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি বাড়ে, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
শিল্প মালিকরা সস্তা শ্রমকে শক্তির বদলে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ কারণে বর্তমান বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি হলেও এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। পাশাপাশি শ্রমিক ও তার পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতেও খুব অল্প সংখ্যক শিল্প মালিকই এগিয়ে এসেছেন। অথচ শ্রমিকদের দুপুরের খাবার, চিকিৎসা, ডে-কেয়ার সেন্টারসহ বিভিন্ন সেবা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মালিকদের মুনাফা কমেনি। বরং অসন্তোষ কম থাকায় পোষাক উৎপাদন নির্বিঘ্ন হচ্ছে না।
বছরে বছরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরী বহু আন্দোলন ছাড়া কখনই বাড়ে না। আন্দোলনের চাপে গত তিন দশকে কয়েক দফা মজুরী বেড়ে নিুতম মজুরী এখন দাঁড়িয়েছে বেসিক ৩ হাজার টাকায়। প্রত্যেকবারই শ্রমিকরা আন্দোলন করে বুকের রক্ত ঢেলে মজুরী বৃদ্ধি করতে মালিকদেরকে বাধ্য করেছে। ২০১৩ সালে যে মজুরী কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে সেই নিুতম মজুরীও অনেক কারখানায় ঠিকমত দিচ্ছে না মালিকরা। শিক্ষানবিশ হিসেবে ৩-৬ মাস পর্যন্ত ৪২০০ টাকা করে মজুরী দেয়া হয়। যেসব শ্রমিক পুরনো মজুরী কাঠামোতে তৃতীয় গ্রেডে বেতন পেতেন তাদেরকে ৪র্থ বা ৫ম গ্রেডে বেতন দেয়া হচ্ছে। ওভার টাইমের ভাতা কমিয়ে দিচ্ছে। নাইট বিল কমিয়ে কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বলছে যত সময় লাগুক কাজ করতে হবে, টার্গেট পূরণ করতে হবে। এর জন্য মালিক অতিরিক্ত মজুরী দিচ্ছে না। নতুন মজুরী কাঠামো বাস্তবায়নের নামে শ্রমিকদের উপর শোষণ-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, তিন জন শ্রমিকের কাজ দুই জনকে শ্রমিককে দিয়ে করানো হচ্ছে। অনেক কারখানায় হাজিরা বোনাস, বিশেষ ভাতা, পারদর্শী ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিত। বর্তমানে সেগুলো কমিয়ে দেয়া হয়েছে, বেশির ভাগ কারখানায় সেই সব সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইপিজেড সহ সকল শ্রমিকদের সর্বশেষ বেতন বাড়ানোর ছয় মাসের ব্যবধানেই শ্রমিকদের বেতন কমেছে কারণ মজুরী বৃদ্ধির পর থেকেই অস্বাভাবিকভাবে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাস্তবে মজুরী পূর্বের চেয়েও কমে গেছে। গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের বাসস্থানের কোন ব্যবস্থা না করায় বাড়ী-মালিকরা দফায় দফায় বাসা-ভাড়া বাড়িয়ে শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরীর বড় অংশই আত্মসাৎ করে নিয়েছে। এভাবে মজুরী বৃদ্ধি শ্রমিকদের কোন কাজেই লাগেনি। অন্যদিকে বিবিধভাবেই নিুতম মজুরী বেসিক ৩ হাজার টাকা করা হলেও শ্রমিকরা অনেকেই পাচ্ছেন তারও কম। এভাবে মালিক সমিতি বিজিএমইএ এবং শ্রম মন্ত্রণালয় এক প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এসব অভিযোগ শ্রমিক নেতারা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ে জানালেও এর প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা সরকারপক্ষ নেয়নি।
২০১৩-এর নভেম্বর-এ যে মজুরী কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে তা বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে কম। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মজুরী প্রতি ঘণ্টায় ৫৫ থেকে ৬৮ সেন্ট। অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৯ টাকা থেকে ৪৮ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরী প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ১৪ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। চলতি ২০১৮ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানি করে দুই হাজার ৮১৩ কোটি (২৮.১৩ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। মূলত তৈরি পোশাকের ওপর ভর করেই রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। অর্থবছর শেষে এই খাতের রপ্তানি ৩০ বিলিয়ন (৩ হাজার কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন রপ্তানিকারকরা।
জানা যায়, বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশ দুটির রপ্তানি ব্যবধান ১১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী । আগামী দিনগুলোতে রপ্তানি আয় আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। তবে টাকার বিপরীতে ডলারের দরবৃদ্ধি রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে অবদান রাখছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা । বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দর বেড়েছে ৪ শতাংশের বেশি। ছয় মাসে বেড়েছে ৩ শতাংশ। অর্থবছরের শেষ মাসেও (জুন) রপ্তানি আয় বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা । শিপ্ল মালিকরা কনে করেন, কারখানাগুলোর উন্নয়নে মালিকরা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কষ্টও করেছেন। ৮০ শতাংশের বেশি কারখানা উন্নত কর্মপরিবেশের (কমপ্লায়েন্স) আওতায় চলে এসেছে। এতে বায়াররাও খুশি। যার ইতিবাচক ফল শিল্প মালিকরা পাচ্ছে । সামগ্রিক রপ্তানিতে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০ শতাংশ। এবার পোশাক রপ্তানি ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করায় পোশাকের অর্ডার দিচ্ছেন ভায়াররা । গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বড় ধসের পর অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল প্রতি মাসেই বেড়েছে রপ্তানি আয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই মে) বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ তিন হাজার ৩৭৩ কোটি (৩৩.৭৩ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে। এই অঙ্ক গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। এই ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল তিন হাজার ৩৮৭ কোটি ৭০ লাখ (৩৩.৮৭ বিলিয়ন) ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে তিন হাজার ১৬২ কোটি ২৮ লাখ (৩১.৬২ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে দুই হাজার ৮১৩ কোটি (২৮.১৩ বিলিয়ন) ডলারের যে আয় হয়েছে তার ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতের পণ্য রপ্তানিতে এক হাজার ৩৯৪ কোটি ডলার এবং উভেন পোশাক রপ্তানিতে এক হাজার ৪১৯ কোটি ডলার আয় হয়েছে। এই ১১ মাসে নিট খাতে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আর উভেনে বেড়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এতে দেখা যায় বাংলাদেশী মালিকরা অনেক বেশি মুনাফা করলেও শ্রমিকদের সবচেয়ে কম মজুরী দেয়। আর এ কারণেই শ্রমিকরা মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০১৩ সালে নতুন মজুরী কাঠামোর পর সরকার দফায় দফায় গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি করায় নিত্য পণ্যের মূল্য, বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ভাড়া গত পাঁচ বছরে তিন গুণ বেড়েছে। যার পরিসংখ্যান এখানে দেয়ার প্রয়োজন নেই। শ্রমিক ও জনতা প্রত্যক্ষ জীবন থেকেই বুঝতে পারছেন। বস্তিতে ছোট এক রুমের ভাড়া ৪ হাজার টাকার কমে পাওয়া যাচ্ছে না ঢাকা শহরে। তা-ও ৫/৭টা পরিবার মিলে এক বাথরুম, ১/২টা টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। রাত ৯/১০টায় ঘরে ফিরে রান্না করে খেয়ে রাত ১২টার আগে ঘুমাতে যাওয়ার উপায় নেই। আবার ভোর ৪টা থেকে লাইন ধরে গোসল, রান্না, খাওয়া সেরে সকাল ৮টার আগে কারখানায় পৌঁছাতে হয়। ১মিনিট লেট হলেই হাজিরা বোনাস কেটে নেয়া হয়, গেইটে দাড়করিয়ে খারাপ ব্যবহার করা হয়। এরকম ঘর ভাড়া দিতেই ৪ হাজার টাকা চলে যায়। ওভার টাইমের টাকা দিয়ে সারা মাসের খাওয়া, চিকিৎসা, কাপড় ইত্যাদি খরচ চালাতে হয়। উপরন্তু মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানতো রয়েছেই। উপায়ান্তর না পেয়ে শ্রমিকরা একরুমে ৪/৫ জন গাদাগাদি করে আলো-বাতাসহীন দুর্গন্ধযুক্ত ঘরে বাস করেন। কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে অন্যদের দায়িত্ব পালন করেন। এই কারণেই শ্রমিকরা ওভার টাইম করতে চান। তারা ন্যয্য মজুরী পেলে এই অমানুষিক পরিশ্রম তারা করতেন না। শ্রমিকদের অনাবিল দাম্পত্য জীবন, বিনোদন বলতে কিছু নেই। ভাড়া বাড়িতেও শ্রমিকদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। সন্তান-ভাই-বোনদের নিয়ে বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না বাড়িওয়ালারা। তারা তথাকথিত নিরিবিলির জন্য ছোট পরিবার ভাড়া দিয়ে থাকেন। আগামীতে বাড়ি ভাড়া, দ্রব্যমূল্য আরো বাড়বে, কারণ বর্তমান সরকার আবারো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। বিদ্যুতের মূল্য বাড়ছে। তাই, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বর্তমান মজুরীতে কোনো মতেই চলছে না। মজুরী বৃদ্ধির আন্দোলনে ফের শ্রমিকদের নামতে হবে। কারণ মালিকরা আন্দোলন ছাড়া বেতন বৃদ্ধি করবে না। কারণ নিম্নতম মজুরী বোর্ড গঠন হলেও তার কার্ষক্রম নেই কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন হলে বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সরকার-মালিক মিলে কোরাসে গাইতে থাকে এটি উসকানি, নাশকতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বলে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় পুঁজিপতিরা বা সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশগুলো বাজার দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি এবং ষড়যন্ত্র করে থাকে। কথা হচ্ছে এই ষড়যন্ত্রকারী দেশ ও ব্যক্তিদের নাম সরকার কখনই প্রকাশ করে না। এবারও তাজরীন ও রানাপ্লাজায় শ্রমিক হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করেছে। আর এর বলি করা হয়েছে শ্রমিকদেরই। শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে, রিমাণ্ডে পাঠিয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য কোনো তদন্ত ছাড়াই প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামাতকে দায়ী করেছে। মালিকদের রক্ষার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করা হয়। মালিকদের জানমাল রক্ষা এবং শ্রমিক বিক্ষোভকে দমনের জন্য ঘটনাস্থলে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে। অথচ জীবিত শ্রমিকদের বেতন দিতে, তাদের ছাঁটাই বন্ধ করতে, তাদের চাকরীর নিশ্চয়তার কোনো ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রী করেনি। শ্রমিকদের প্রতিটি ন্যায্য আন্দোলন দমনে প্রত্যেক সরকারই এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। বুর্জোয়া আইনে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান থাকলেও মালিকরা সে অধিকার দিচ্ছে না। ইউনিয়ন করতে গেলে বা কোনো ইউনিয়নের সাথে যুক্ত আছে জানতে পারলে মামলা-হামলা নির্যাতন করে সেই শ্রমিককে ছাঁটাই করে। শ্রমিকদের উপর মালিকদের এই মধ্যযুগীয় শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো সরকারই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, নিচ্ছে না। উপরন্তু বর্তমান সরকার শ্রমিক দমনে ইণ্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন করেছে।
আজকে শ্রমিকদের এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে যে, বুর্জোয়া শ্রম আইন, বুর্জোয়া আদালত, সরকার, এদের রাষ্ট্রব্যবস্থা মধ্যযুগীয় এই দাসত্ব থেকে তাদের মুক্তি দেবে না। প্রতিবার মজুরী বৃদ্ধি রক্তাক্ত আন্দোলনের মাধ্যমেই করতে হয়েছে, কিন্তু তাতে সমস্যার কোনো সমাধানই হচ্ছে না। তাই, শ্রমিক শ্রেণীকে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসক শ্রেণী তথা মালিক শ্রেণীর শোষণ-নির্যাতন-লাঞ্ছনার ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্য লড়তে হবে। লড়তে হবে নিজেদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা নেবার জন্য। এবং প্রতিষ্ঠা করতে হবে পুঁজিবাদের বদলে সমাজতন্ত্র। বুর্জোয়া আইন, বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদের এবং শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। আশু দাবি-দাওয়ার আন্দোলন যা নাকি বিপ্লবী রাজনীতিকে সহায়তা করে এমন ধারার ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে হবে। যে ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করবে। যার নেতারা টাকার বিনিময়ে মালিকদের, সরকার তথা শাসক শ্রেণীর কাছে বিক্রি হবে না। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরে লাগাতার সংগ্রাম চালাবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত। কেবল বিপ্লবী ধারার রাজনীতি, এবং তার সমর্থনে বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়নই শ্রমিক শ্রেণীকে মুক্তির দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

লেখকঃ খাইরুল মামুন মিন্টু
সাংগঠিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Monday, June 4, 2018

ইফতার ও আলচনা সভা

আশুলিয়া থানা রিক্সা ও ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যেগে আজ ০৪ জুন ২০১৮ সোমবার, বিকাল ৫ ঘটিকায়, আলমের গ্যারেজে,  ইফতার ও আলচনা সভা এর অনুষ্ঠিত হয় । আলোচনা সভায় আশুলিয়া থানা রিক্সা ও ভ্যান ইউনিয়ন এর সভাপতি আলম পারভেজ এর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রে’র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খাইরুল মামুন মিন্টু, আশুলিয়া থানা রিক্সা ও ভ্যান ইউনিয়ন এর সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হোসেন, সহ সভাপতি নান্নু মিয়া, সহসাধারণ সম্পাদক মামুন দেওয়ান এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রে’র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটি’র সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম । আলোচনা সভা থেকে  রিক্সা, ভ্যান, অটো-রিক্সা চলাচলে বাধাপ্রদান ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে চাদাবাজি,চাঁদা না দিলে ব্যাটারি খুলে নেওয়ার প্রতিবাদ জানানো হয় ।