Biplobi Barta

Sunday, July 22, 2018

বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের কথা চিন্তা করলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নিম্নতম মাসিক বেতন ১৬ হাজার টাকা করার যে দাবি তোলা হয়েছে, তা যৌক্তিক বলেই আমি মনে করি।


চার দশকে দেশের পোশাক শিল্পের উন্নতি অন্য রকম। ৪০ হাজার ডলারের রফতানি আয় পৌঁছেছে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারে। স্ফীত হয়েছে মালিকদের সম্পদ। এর সবটাই সম্ভব করেছে সস্তা শ্রম ও শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা। এ শিল্পের ভরসার জায়গাও এখনো নিম্ন মজুরিই। ১৯৮৫ সাল থেকে কয়েক দফা বেড়ে ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ (৬৬ দশমিক ২৫ ডলার) টাকায় পৌঁছেছে শ্রমিকদের নিম্নতম মাসিক মজুরি। তারপরও তা এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মজুরির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কম্বোডিয়ায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৪০ ডলার। ভিয়েতনামে এ মজুরি প্রায় ১৪৭ ডলার, ফিলিপাইনে ২০২, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৬০, মালয়েশিয়ায় ২২৩, থাইল্যান্ডে ২৬৫, চীনে ২৩৪ ও মিয়ানমারে ৮০ ডলার। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতে নিম্নতম মাসিক মজুরি প্রায় ১৪৪ ডলার, পাকিস্তানে ১০৬, শ্রীলংকায় প্রায় ৬৯, নেপালে ৭৪ ও আফগানিস্তানে ৭৩ ডলার।
তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশের বিদ্যমান এ মজুরিকেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন না গার্মেন্ট শ্রমিকরা। ২০১৩ সালে নিম্নতম মজুরি কমিশনের মাধ্যমে যে মজুরি নির্ধারণ করা হচ্ছে, বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে তা বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে কিন্তু অনেক কারখানার মালিকরা তা মানেন না। তার পরেও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে মজুরি বৃদ্ধির এ হার কোন ভাবেই ইতিবাচক না। তাই আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান মজুরি কোন ভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ না।
দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত পোশাক শিল্পে ১৯৮৫ সালে নিম্নতম মজুরি ছিল ৫৪২ টাকা। ১৯৯৪ সালে এটি বাড়িয়ে ৯৩০ টাকা করা হয়। এর এক যুগ পর ২০০৬ সালে মজুরি বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৬৬২ টাকা। এর পর ২০১০ সালে নিম্নতম মজুরি বেড়ে হয় ৩ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০১৩ সালে নিম্নতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে নিম্নতম মজুরি কমিশন। তবে মজুরি বৃদ্ধির জন্য প্রতিবারই আন্দোলন করতে হয়েছে শ্রমিকদের। অনেকটা নিয়ম মেনেই বিভিন্ন অজুহাতে মজুরি বৃদ্ধিতে অনীহা দেখিয়েছেন শিল্প মালিকরা। ২০১৮ সালেও তার ব্যতিক্ষম না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক শিল্পে কর্মরতদের মধ্যে একটি বড় অংশ নিম্নহারে মজুরি পায়। এ খাতের ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিকের মজুরি ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে ৭০ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক ৫-৭ হাজার টাকা মজুরি পান।
গার্মেন্ট মালিকেরা শ্রমিকদের বোঝাতে চান “অর্থনীতির প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে মজুরিকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক নয় বলে মনে করেন গার্মেন্ট মালিকেরা। তেনারা মনে করেন, এর সঙ্গে আরো বেশকিছু বিষয় জড়িত। শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা কতটুকু তা দেখতে হবে। চীনে মজুরি যেমন আমাদের চেয়ে বেশি, সেখানে কর্মদক্ষতাও বেশি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে এখানে যে মজুরি দেয়া হয়, তা অন্য অনেক দেশের জীবনযাপন ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট। আবার এখানে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য যেসব ব্যয় রয়েছে, তা তুলনামূলক বেশি। এসব বিষয়ই পরস্পর-সংশ্লিষ্ট। আরেকটি বিষয় হলো, দেশে শ্রমের মজুরি কম হলেও বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক কাজে নিয়োজিতের ঘটনা নেই”।
গার্মেন্ট মালিকদের এই কথা কোন ভাবেই মেনে নেওয়ার মত না, কারণ আমাদের দেশের শ্রমিকদের কর্মদক্ষতার কারনেই গার্মেন্ট শিল্প আজ দিনে দিনে বিকশিত হচ্ছে। দেশের জীবনযাপন ব্যয়ের তুলনায় শ্রমিকদের অনেক কম মজুরি দিয়ে বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক ওভার টাইম করানো হচ্ছে।
সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে শ্রমশক্তি দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের উৎপাদন, নির্মাণ, কৃষি ও মত্স্য খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম গড় মজুরি ৯ হাজার টাকারও বেশি।
দেশের খাতভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আমি মনে করি। বিপুল জনগোষ্ঠী আমাদের দেশের জন্য সম্পদ। তবে এখানে বৈষম্যপূর্ণ মজুরি কাঠামো বিদ্যমান। বৈষম্যমূলক এ মজুরি কাঠামোর ফলে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও শ্রমের ক্ষেত্রে এক ধরনের এক্সপ্লয়টেশন রয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তবে সরকার ও মালিকদের সদিচ্ছার অভাবে সেটি হচ্ছে না।
জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (ইউএন-এসকাপ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে শ্রম উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্থানে। বাংলাদেশে শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা বছরে মাত্র ৮ হাজার ডলার। এর চেয়ে কম শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা রয়েছে শুধু কম্বোডিয়ায়। দেশটির শ্রমিকদের গড় উৎপাদনশীলতা ৬ হাজার ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ১৪তম, পাকিস্তান ২০ ও ভারত ২২তম স্থানে রয়েছে। দেশ তিনটির শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা যথাক্রমে ২৩ হাজার, ১৮ হাজার ও ১৫ হাজার ডলার।
সংস্থাটি তথ্য বলছে, শ্রমের মজুরির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। নিম্ন উৎপাদনশীলতার এটি অন্যতম কারণ। এজন্য বিভিন্ন খাতে মজুরি বাড়ানোর প্রতি নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত উপকরণ তথা শ্রমের দক্ষ ব্যবহারের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে। কারণ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেশি হলে অধিক বিনিয়োগ ও অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া ব্যবহূত উপকরণগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি বাড়ে, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প মালিকরা সস্তা শ্রমকে শক্তির বদলে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ কারণে বর্তমান বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি হলেও এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। পাশাপাশি শ্রমিক ও তার পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতেও খুব অল্প সংখ্যক শিল্প মালিকই এগিয়ে এসেছেন। অথচ শ্রমিকদের দুপুরের খাবার, চিকিৎসা, ডে-কেয়ার সেন্টারসহ বিভিন্ন সেবা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মালিকদের মুনাফা কমেনি। বরং অসন্তোষ কম থাকায় উৎপাদন নির্বিঘ্ন হচ্ছে।
অথচ আজ দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এ দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য ২০১৮ সালে এসে আবার একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হচ্ছে। এতে মালিকপক্ষ থেকে ন্যূনতম মূল মজুরি তিন হাজার ছয় শত টাকা ধরে, ছয় হাজার ৩০০ টাকা নিম্নতম মোট মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছর ০৫% হারে বেতন বৃদ্ধির হিসাব করলে ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ৭৪২ টাকা কম প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তখন তিন হাজার টাকা মূল বেতন ধরে পোশাক শ্রমিকদের জন্য ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের কথা চিন্তা করলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নিম্নতম মাসিক বেতন ১৬ হাজার টাকা করার যে দাবি তোলা হয়েছে, তা যৌক্তিক বলেই আমি মনে করি।

বিগত বেতন বোর্ড সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করেছে। গত পাঁচ বছরে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন এক পয়সা না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। এর অর্থ শ্রমিকদের প্রকৃত বেতন আরও কমে গেছে। শিল্পের উন্নয়ন চাইলে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে হবে। শ্রমিকদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার মতো মজুরি দিতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না শ্রমিকদের পেছনে মালিকপক্ষ যে বিনিয়োগ করবে, অনেক বেশি তা তুলে নিতে পারবে।

লেখকঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, সাংগঠিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র


মালিকরা যেনতেন একটা মজুরি ঘোষণা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।



সাল
নিম্নতম মোট মজুরী
প্রতি বছর মজুরী বৃদ্ধির পরিমাণ
প্রতি বছর মজুরী বৃদ্ধি
সর্বশেষ নিম্নতম মোট মজুরীর পরিমাণ
২০১৩



৫,৩০০/=
২০১৪
৫,৩০০/=
০৫%
২৬৫/=
৫,৫৬৫/=
২০১৫
৫,৫৬৫/=
০৫%
২৭৮/=
৫,৮৪৩/=
২০১৬
৫,৮৪৩/=
০৫%
২৯২/=
৬,১৩৫/=
২০১৭
৬,১৩৫/=
০৫%
৩০৬/=
৬,৪৪২/=
২০১৮
৬,৪৪২/=
০৫%
৩২২/=
৬,৭৬৪/=
২০১৯
৬,৭৬৪/=
০৫%
৩৩৮/=
৭,১০২/=
বর্তমান মজুরী বোর্ডের সভায় মালিক প্রতিনিধি নিম্নতম মজুরী প্রস্তাবনা



৬ হাজার ৩৬০ টাকা
গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরী কমানোর প্রস্তাব



৭৪২ টাকা

 
মজুরী বোর্ডের সভায় মালিক প্রতিনিধি নিম্নতম মজুরী ৬ হাজার ৩৬০ টাকা প্রস্তাবনা করেছেন যাহা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক ও দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ শ্রমিকদের যেখানে মজুরী বাড়ানোর কথা সেখানে এই প্রস্তাবনার মধ্যদিয়ে ৭৪২ টাকা কমানো ষড়যন্ত্র। বিজিএমইএ প্রমাণ করেছে যে, তারা সুষ্ঠ শিল্প মালিক নয়। তারা চরম শোষক ও নিপীড়ক, তাই এই অমানবিক প্রস্তাবনা পরিবর্তন করে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন শিল্পকে বিকাশিত করা ও জাতীয় অর্থনীতিক উন্নয়নের স্বার্থে নিম্নতম মোট মজুরী ১৬ হাজার টাকা মেনে নেয়ার আহবান জানাচ্ছি। এমনকি শ্রমিক প্রতিনিধি নিম্নতম মোট মজুরী ১২ হাজার ২০ টাকা যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে তাও বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিক প্রতিনিধি ইতিমধ্যেই বলেছেন যে, তিনি শুধু শ্রমিক সংগঠনের সাথেই যুক্ত তা নয় একই সাথে রাজনৈতিক দলেরও লোক। তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে প্রকারন্তরে শ্রমিকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মালিকদের স্বার্থ রক্ষার ফাদে পা দিয়েছেন। দেশের বর্তমান বাজার দরের সাথে মজুরীর প্রস্তাবনা কোনোভাবেই সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেখানে গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলে বস্তি বা টিনশেডের একটি রুমের ভাড়াই ৪-৫ হাজার টাকা দিতে হয়। সেখানে শ্রমিকদের খাদ্য, চিকিৎসা শিক্ষাসহ বেঁচে থাকার মত ন্যূনতম চাহিদা কিভাবে মিটাবে? আজ মজুরি বোর্ডের নির্ধারিত মিটিং-এ মালিক পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবনা করা হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মালিক সরকার মিলে মজুরি বৃদ্ধির নামে প্রহসন মঞ্চাস্থ করতে যাচ্ছেন।মালিকরা বাজার দর, আইএলও কনভেনশন, মুদ্রাস্ফীতি, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং শ্রমিকের জীবনমান কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে যে মজুরি প্রস্তাব করেছেন তা এদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকসহ সকল বিবেকবান মানুষ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন না। অন্যদিকে শ্রমিক প্রতিনিধি পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা শ্রমিকদের প্রাণের দাবি ১৬ হাজার টাকার বিষয়টি তোয়াক্কা না করে মালিকদের স্বার্থকেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। যা এদেশের প্রায় ৪০ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিক কোনোভাবেই মেনে নিবে না। মালিকরা যেনতেন একটা মজুরি ঘোষণা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সেই নীল নকশা বাস্তবায়নে তারা মিথ্যা মামলা দিয়ে গার্মেন্ট টিইউসি’র নেতৃবৃন্দকে দমন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মালিকদের কোন ষড়যন্ত্রই মজুরি আন্দোলনকে দমন করতে পারবে না।এমতাবস্থায় আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি যে, অবিলম্বে নিম্নতম মূল মজুরী ১০ হাজার টাকা আর মোট মজুরী ১৬ হাজার টাকা এবং একই হারে পিসরেটসহ সকল শ্রমিকদের মজুরী ঘোষণা করতে হবে। ১৬ হাজার টাকা মজুরীর দাবিতে আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

Tuesday, July 17, 2018

মজুরি বোর্ড এ উত্থাপিত প্রস্তাবনা গ্রহণযোগ্য নয়

শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়া প্রস্তাবিত ১২ হাজার ২০ টাকা মোট মজুরির মধ্যে মূল মজুরি ৭ হাজার ৫০ টাকা, মূল মজুরির ৪০ শতাংশ হিসেবে বাড়ি ভাড়া ২ হাজার ৮২০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৫০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ৬৫০ টাকা আছে। এ ছাড়া ৬ নম্বর গ্রেডে ১২ হাজার ৯৩০ টাকা, ৫ নম্বর গ্রেডে ১৩ হাজার ৯১০ টাকা, ৪ নম্বর গ্রেডে ১৪ হাজার ৯১০ টাকা, ৩ নম্বর গ্রেডে ১৬ হাজার ১৫০ টাকা, ২ নম্বর গ্রেডে ১৭ হাজার ৫৫০ টাকা এবং ১ নম্বর গ্রেডে ২১ হাজার ৫০ টাকা প্রস্তাব করেন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি।
 
এ ছাড়া পোশাক কারখানায় কর্মচারীদের জন্য সর্বনিম্ন ১১ হাজার ৯৫০ টাকা মজুরি প্রস্তাব করেন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়া। একই সঙ্গে মূল মজুরির ওপর প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব করেন তিনি। এ ছাড়া শ্রমিক ও কর্মচারী উভয়ের জন্য ২টি উৎসব ভাতা এবং মূল মজুরি ২০ শতাংশ হিসেবে বৈশাখী ভাতার প্রস্তাব করেন শ্রমিক প্রতিনিধি।

অন্যদিকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. সিদ্দিকুর রহমান পোশাক শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি ৬ হাজার ৩৬০ টাকা প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে মূল মজুরি ৩ হাজার ৬০০ টাকা, মূল মজুরির ৪০ শতাংশ হারে বাসা ভাড়া ১ হাজার ৪৪০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৩০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ২৪০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ৭৮০ টাকা। সব মিলিয়ে বর্তমানের চেয়ে ২০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে মালিকপক্ষ। তারা ৬ নম্বর গ্রেডের জন্য ৬ হাজার ৭৫২ টাকা ৫ নম্বর গ্রেডের জন্য ৭ হাজার ১৭৬ টাকা, ৪ নম্বর গ্রেডের জন্য ৭ হাজার ৬০৪ টাকা, ৩ নম্বর গ্রেডের জন্য ৭ হাজার ৯৮৩ টাকা প্রস্তাব করেছে। তবে ১ এবং ২ নম্বর গ্রেডের জন্য কোনো মজুরি প্রস্তাব করেনি মালিকপক্ষ।

মজুরি বোর্ড এ উত্থাপিত প্রস্তাবনা গ্রহণযোগ্য নয়, কারন সবাই অবগত ২০১৩ সালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরী বেসিক ৩,০০০ টাকা, গ্রস ৫,৩০০ টাকা নির্ধারণ করেছিল নিম্নতম মজুরী বোর্ড। তখন গার্মেন্ট শ্রমিকদের দাবি ছিল ৮,০০০ টাকা। ৫ বছর পর ২০১৮ সালে এসে গার্মেন্ট মালিকেরা মাত্র ৬০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি করতে চায়। মজুরি বোর্ড এ মালিকদের উত্থাপিত প্রস্তাবনা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, নিম্নতম মজুরী বোর্ড গঠন হওয়ার সময় আমরা সরকারকে বলেছিলাম "মজুরী বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধি শ্রমিকনেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিক প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হবে। অথচ আমরা দেখলাম গার্মেন্ট মালিকদের পছন্দ মত তাদের অনুগত শ্রমিক প্রতিনিধি নির্ধারণ করলেন। মজুরী বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি গার্মেন্ট মালিকদের কতটা অনুগত গতকাল ১৬ জুলাই নিম্নতম বেসিক ৭,০৫০, গ্রস ১২,০২০ টাকা প্রস্তাব করে তার প্রমান দিলেন, যেখানে গার্মেন্ট শ্রমিকেরা নিম্নতম মজুরী বেসিক ১০,০০০, গ্রস ১৬,০০০ টাকা দাবী জানিয়ে আসছে। তাহলে মজুরী বোর্ডে শামসুর নাহার ভুইয়া শ্রমিকদের প্রতিনিধি কিভাবে হল। মজুরী বোর্ডের এই নাটক গার্মেন্ট শ্রমিকেরা দেখতে চায়না। এই ধরনের নাটক গার্মেন্ট শিল্পের জন্য ভাল হবেনা। বর্তমানে গার্মেন্ট মালিকেরা যেমন ভাল থাকতে চায় তেমনি শ্রমিকেরাও একটু ভাল থাকতে চায়।
তাই মজুরী বোর্ডের এই নাটক বন্ধ করে অবিলম্বে গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য ১৬,০০০ টাকা নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করুণ।

লেখকঃ খাইরুল মামুন মিন্টু, সাংগঠিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র । 

Sunday, July 1, 2018

সংবিধানের মূলনীতি-- তবু গণতন্ত্রকে আমরা খুঁজে বেড়াব

বাংলাদেশের মানচিত্র বারবার কাটাছেঁড়া হয়েছে। সাধারণ চলিত একটা কথা আছে: ‘লাশ ভাসা বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা’। তবে বারবার এই বিভাজনের দায় বাংলার জনসাধারণের নয়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের দুষ্টচক্রের ফলেই বারবার এই বিভাজন। ১৯০৫ সালে বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদ ঘটেছিল ইংরেজ শাসকদের উপনিবেশী স্বার্থে। ১৯৪৭-এর বিভাজন ছিল মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ভারতবর্ষে মুসলিম আর হিন্দু দুটি পৃথক জাতি, অখণ্ড ভারতে তারা একসঙ্গে থাকতে পারে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়েছিল ধর্ম-ভাষা-বর্ণ-বিত্তনির্বিশেষে ভারতবর্ষের প্রায় ২০ লাখ নিরীহ মানুষকে।
তবে আমরা সবাই জানি, সর্বশেষ যে বিভাজন, তাকে কেউ বিভাজন বলে না, মুক্তিযুদ্ধ বলে। এই বিভাজনের ফলে উপনিবেশী শোষণ উচ্ছেদ করে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়—স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক এক রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। প্রণয়ন করা হয় এক অনন্যসাধারণ সংবিধান। সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
নয় মাসের অবর্ণনীয় কষ্টের পর শুধু মুক্তি আর জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে কঠিন সময় পেরিয়ে যাওয়ার এত দৃঢ় মনোবল আর কখনো দেখিনি। তবু ঠিক এরই মাঝখানে থেকে যে বাংলাদেশ গঠন পেতে শুরু করে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের লাল টকটকে রক্তে স্নাত বাংলাদেশ, হাজার বছরের বাঙালির স্বপ্ন বাংলাদেশের যখন সত্যিই বাস্তবে রূপ পেতে থাকে মায়াহীন, স্বপ্নহীন বাস্তবের রুক্ষ-কঠিন জমি থেকে, তখন তার মধ্যেই দেখা দেয় যত্রতত্র চোরাবালি। সে কথা বলার লোক থাকলেও শোনার লোক ছিল না। কিংবা বলারও লোক ছিল না, শোনারও লোক ছিল না। এই অবস্থায় কোথাও এতটুকু দ্বিধা বা আপত্তি প্রকাশ করাটাও যেন একটা স্যাক্রিলেজ। তা যেন অসহ্য ঔদ্ধত্য, বিরক্তিকর বেয়াদপি। চিন্তা নয়, ভেসে যাওয়াটাই তখন বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধে পাওয়া শরতের নির্মল ভোরের সূর্যের মতো রক্তে ডোবানো বাংলাদেশ কি বিজয়ের পরদিন থেকেই পালাতে শুরু করেছিল? সে কি কেবলই পিছলে পিছলে সরে যাচ্ছিল? এ কথা বাহাত্তরের গোড়ায় যে বলতে পারে, এমনকি চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ-দুর্গতির দিনেও যে বলতে পারে, তাকে হঠকারীই বলা উচিত। বুকে থাপ্পড় মেরে গর্বের সঙ্গে ভাঙা দেয়ালের ওপর মোরগের মতো ডানা ঝাপটে বলা যায় বৈকি যে বাংলাদেশ তার যাত্রার শুরুতেই গণতন্ত্রের ধ্রুবপদ বেঁধে নিয়েছে। গণতন্ত্রের লড়াই আমরা কখনো থামাইনি এবং সেই লড়াই আজও চলছে। পাকিস্তানিরা ২৪ বছরের শাসনে আমাদের এক দিনের জন্যও গণতন্ত্র দেয়নি, পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই গণতন্ত্র তার নাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কোনো না কোনোভাবে সেনাবাহিনী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল একটানা, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানই যখন গোটা পাকিস্তান হয়ে গেল, তখনো তার গণতন্ত্র সহ্য হয়নি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ সম্বন্ধে কি বলা যাবে? মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে আসা বাংলাদেশ কেন বিজয়ের কমবেশি সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই পাকিস্তানি ঐতিহ্যই অনুসরণ করে বসল? আমাদের সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করল, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতাদের অতি নৃশংসভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। তবু নতুন শাসকদের কাছে তারা শাস্তি পেল না, পুরস্কারই পেল।
নব্বই সাল পর্যন্ত বুলেটঘেরা এই গণতন্ত্রের মধ্যে আমাদের কেটে গেল। লাতিন আমেরিকার নিষ্ঠুর স্বৈরতন্ত্র নয়, বাংলাদেশের মোলায়েম গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার। তারপর দেশের সম্পদ কবজা করা সেনাবাহিনী থেকে দলে দলে অবসরপ্রাপ্তরা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে আসে—এসবই অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি! কিন্তু এখন যে তার চেয়েও বড় কথা দাঁড়িয়ে গেছে। নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও বছর চারেক তার
চর্চার পরপর আজ কারও কারও কাছে কি মনে হচ্ছে বর্তমান গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনায় স্বৈরাচার আরেকটু গণতান্ত্রিক ছিল? সর্বনাশ! গণতন্ত্র কি এখন দশদশায় এসে পৌঁছেছে?
এটা আমাদের গৌরবের কথাই বটে যে গণতন্ত্রকে আমরা কখনোই ফেলে দিতে পারিনি; কখনো ফেলে দেওয়া যাবেও না। রাষ্ট্রব্যবস্থায় কিছু ফল পেতে গেলে গণতন্ত্র থেকেই পেতে হবে, কিন্তু এই নির্মম সত্য কথাগুলোও মনে রাখা দরকার যে সবচেয়ে বড় আদর্শের স্লোগানগুলো গণতন্ত্রের মধ্যেই আউড়ে যাওয়া চলে, জনসাধারণের সর্বনাশ চালিয়ে যেতে যেতেও জনগণের ক্ষমতার কথা নিয়ে গলা ফাটানো যায়। সত্যিই গণতন্ত্রের মতো এমন নির্দোষ নিরাপদ সর্বধারক স্থিতিস্থাপক পাত্র আর কোথায় পাওয়া যাবে? গণতন্ত্রের মধ্যেই কেবল একাত্তরের ঘাতক মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা যায়, বাংলাদেশের মৌলিক অস্তিত্ববিরোধী অনুশোচনাশূন্য অতি নিকৃষ্ট যুদ্ধাপরাধীটিকেও রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা যায়, গণতন্ত্রের খাতিরেই মৌলবাদী উত্থানের সঙ্গে সহাবস্থান করা যায়, ভয়াবহ সন্ত্রাসকে গণতান্ত্রিকভাবেই জনগণের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া যায়। এক গণতন্ত্রেই কেবল ২৪ বছরের মধ্যে পাকিস্তানি কোটিপতিদের শূন্যস্থান মুক্তিযুদ্ধোত্তর হাজার হাজার কোটিপতিকে দিয়ে পূরণ করা যায়। শুধু গণতন্ত্রের সাহায্য নিয়েই বাংলাদেশকে মৃতের বাংলাদেশে পরিণত করা যায়। এত অনাহার, এত অশিক্ষা, এত দারিদ্র্য, এত নিরাময়হীন ক্যানসারে আক্রান্ত অব্যবস্থা গণতন্ত্রের বিশাল উদর ছাড়া আর কোথায় জায়গা পেতে পারত? তবু গণতন্ত্রকে ছাড়া যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মতোই গণতন্ত্রকেও আমরা খুঁজে বেড়াব। এ জন্যই গণতন্ত্রকে আমরা ফেলতে পারিনি, কিন্তু সমাজতন্ত্রকে ধরতে না ধরতে ছুড়ে ফেলে দিতে পেরেছি।
তড়িঘড়ি করে আমরা সমাজতন্ত্রের ইঞ্জিন চালিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা ইতিহাসে বিশ্বাস করি না। আমাদের কাছে কোনো কিছুরই পূর্বাপর নেই। আমরা রেডিমেড জিনিস বাজারে ছাড়ি, আবার রেডিমেড জিনিসই বাজার থেকে তুলে নিই। কেনই বা এককথায় সমাজতন্ত্র চালু, কেনই বা এককথায় সমাজতন্ত্রের বিদায়, তা কারও জানার উপায় নেই। জানানোর তোয়াক্কাও নেই। যে বিশ্বাস আর রাজনীতি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন, একেবারে তার বিপরীত প্রান্তে অবস্থান নিয়ে কী করে তাঁর আদর্শেই চলছি বলা যেতে পারে, তা নিয়ে যেহেতু জিজ্ঞাসা নেই, কাজেই উত্তরও নেই। একটা চরম সুবিধাবাদী কথা ‘রাজনীতিতে শেষ কথা নেই’—এটাই হতে পারে একমাত্র উত্তর। সমাজতন্ত্রকে বিদায় জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তার যে একটা মূল কথা—মানুষের সঙ্গে মানুষের ভয়ানক বৈষম্য রাখা যাবে না, এ কথাটারও দায় থেকে মুক্তি পেতে গণতন্ত্রকে এখন অবাধ করা গেছে। পর্বতপ্রমাণ ধনসংগ্রহ, আকাশচুম্বী বিষমতা এখন সমাজের মধ্যে সত্যিই অবাধ। এটা যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী না হয়, তাহলে কী যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, তা আমার জানা নেই।
খুবই ভালো হয়েছে, ১৯৭৫-এর পর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছিবড়ের মতো দূর-দূর করে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো, পাকিস্তানপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে পথের কাঁটা আর কী হতে পারে? নিজেদের বিবেচনাকে আমাদের ধন্যবাদ জানাতে হয় এ জন্য যে দুষ্ট লোকে ধর্মনিরপেক্ষতার যে মানে করে, অর্থাৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্ম-বিবেচনা কোনো ভূমিকা নেবে না, ব্যক্তির ধর্মাচরণে রাষ্ট্র কখনোই হস্তক্ষেপ করবে না এবং ধর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি অনাগ্রহী, উদাসীন থাকবে, শুধু এই ছাড়া যে রাষ্ট্র কারও ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না—সেখানে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ দাঁড়াল সব ধর্মের পোষকতা করা। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের ভূরিপরিমাণ পোষকতা করা। এই পোষকতায় সত্যি সত্যিই ধর্মের পোষকতা হয়েছে কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কিন্তু এই পোষকতাকে যে ধনসম্পত্তি সংগ্রহ ও লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সমাজে ধনবান ও শক্তিমানদের প্রচুর কাজে আসছে, তাতে সন্দেহ নেই। দেখা যায়, রাষ্ট্রের ধর্মপোষকতার সঙ্গে ধর্মের বিন্দুমাত্র যোগ নেই, যোগ আছে লুটের। লুটের স্বার্থেই সমাজ ও রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটাতে হয়।
বাকি রইল আরেকটি স্তম্ভ—জাতীয়তাবাদ। ইতিহাসের পথ প্যাঁচালো। ইতিহাসে জাতীয়তাবাদের পথও প্যাঁচালো। অবিকল দুটি এক রকম জাতীয়তাবাদ কখনো দেখা যায়নি। উগ্র, অত্যুগ্র যে বিশেষণই লাগানো হোক না কেন, জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব বহুবর্ণিলই বটে। আমার ধারণা, বাঙালি হওয়ার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের খুবই প্রয়োজন ছিল। ওই তত্ত্ব দিয়েই আমরা পাকিস্তানি শোষণের চেহারাটা বোঝাতে পেরেছিলাম।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিজস্ব তাত্ত্বিক ব্যবহার কেমন হতে পারে, আমার জানা নেই। কিন্তু প্রবল প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনে-সংগ্রামে তার কী ইতিবাচক ভূমিকা থাকতে পারে, তা আমরা সবাই জানি। কাজেই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বলতে, এমনকি একটা সাবানের বুদ্বুদ বিদ্যমান না থাকলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পাকিস্তানিরা যা বলতে পারত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঠিক তা-ই। পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল না। কারণ, বাংলাদেশই ছিল না, কিন্তু ‘পাক-বাংলার কালচার’, ‘ইসলামাইজেশন’, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’ ইত্যাদি লব্জ তখনো ছিল, যদিও পশ্চিম পাকিস্তানে চার-চারটি জাতি থাকার ফলে পাকিস্তানিরা এ বিষয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করেনি। কিন্তু এখন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে শোরগোল তোলার লোকের অভাব নেই। আমার ধারণা, বাংলাদেশকে একটি সতেজ স্বাস্থে্যর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিতে পারলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটু ক্রুদ্ধ, একটু অসহিষ্ণু ভূমিকার ইতি ঘটত।
বাংলাদেশের এখন স্বাভাবিক বাঙালি হওয়ার রাস্তা নেই, বাঙালি বলতে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে। স্বাভাবিক বাঙালিকে স্বাভাবিকের পথ থেকে সরিয়ে এনে উদ্ভট এক মানুষ বানিয়ে তোলার জন্যই তুলে ধরা হচ্ছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। স্বাভাবিকের পথটাকে খোলা রাখার জন্যই প্রয়োজন বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
বাংলাদেশ-গভীর অন্ধকারে তার ভাঙনের শব্দ, ধস নামার গম্ভীর ধুপধাপ আওয়াজ; ধস নামছে বিক্রমপুরে, ঢাকায়, মানিকগঞ্জে, তিতাসের তীরে, কর্ণফুলীতে, সিলেটে সুরমায়, টাঙ্গাইলে, ভূঞাপুরে, গাইবান্ধায়, তিস্তার পাড়ে, রংপুরে, যমুনায়, সিরাজগঞ্জে—অন্ধকারে, ক্রমাগত ধস নামছে, ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশ, অন্ধকারে, বাতাসের ঝড়ের ঝাপটে জাহাজ ডুবে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যায়, ঢাকার সবচেয়ে দীর্ঘ দালানের চূড়াটি অদৃশ্য হচ্ছে আর ওদিকে উজাড় হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন, চিংড়ি-ডলারের জন্য বন্দুকের নির্দেশে লোনাপানি উঁচু হয়ে আসে, খালপাড়ে রক্তের লবণ লাল টকটকে হয়ে ছড়িয়ে যায়, সব সুন্দরী, গেউয়া মরে যায়, মুমূর্ষু কুকুরের মতো বেঙ্গল টাইগার কেঁউ কেঁউ করে ডাকে, আবার উত্তরের মাটির নিচ থেকে পানি সরে যায়, বিশাল বিশাল ফাটল দেখা দেয় প্রসূতি বাংলাদেশের তলপেটে, বাংলাদেশের মাটির এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত, মাটির ওপরে ক্রমাগত বালিয়াড়ি এগিয়ে আসে। এই সব, এই সব কি বীভৎস বর্ণনা, না বীভৎস বাস্তব!

কাকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে এই যন্ত্রণা?

(২৬ জুন ২০১৮ তারিখে দেওয়া ‘১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ শীর্ষক জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতার সংক্ষেপিত রূপ) 
লেখকঃ  হাসান আজিজুল হক, কথাসাহিত্যিক; সাবেক অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
০১ জুলাই ২০১৮ ইং তারিখ প্রকাশিত প্রথম আলো প্রত্রিকা থেকে নেওয়া ।