Biplobi Barta

Friday, August 25, 2017

গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র বিক্ষোভ সমাবেশ



ঈদের আগে সকল শ্রমিককে এক মাসের মূল মজুরির সমান বোনাস ও বকেয়া পরিশোধের দাবিতে- গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ১১টায় আসন্ন ঈদের পূর্বেই সকল শ্রমিককে এক মাসের মূল মজুরির সমান বোনাসসহ সকল বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে দাবির সমর্থনে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহরের প্রধান সড়কসমূহ প্রদক্ষিণ করে।গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শ্রমিকনেতা অ্যাড. মন্টু ঘোষের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সংগঠনের কার্যকরি সভাপতি শ্রমিকনেতা কাজী রুহুল আমীন, সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা জলি তালুকদার, শ্রমিকনেতা সাদেকুর রহমান শামীম প্রমুখ।সহ-সভাপতি শ্রমিকনেতা জিয়াউল কবির খোকনের পরিচালনায়-সমাবেশে বক্তারা বলেন, প্রতিবারের মত এবারও ঈদে গার্মেন্ট শ্রমিকরা প্রাপ্য বোনাস থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে। দেশে চলমান ব্যাপক বন্যা পরিস্থিতি ও বিচার বিভাগ কেন্দ্রিক বিতর্কের ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের ঠকানোর পাঁয়তারা চালাচ্ছে। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, দেশের গার্মেন্ট শিল্প যে শ্রমিকদের অসামান্য ত্যাগে ও অবদানে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সেই শ্রমিকদের আজ অবধি আর্ত ও দুর্গত করে রাখা হয়েছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এক মাসের মূল বেতনের সমান বোনাস দেয়া হয়। কিন্তু শ্রম আইনের নানা ফাক ফোকরের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এখন পর্যন্ত কিছু সংখ্যক কারখানায় বোনাস পরিশোধ করা হলেও তার পরিমাণ অতি সামান্য, যা দান-খয়রাতের মতই। নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য ঠিকমত পাচ্ছে কিনা সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের হলেও সরকার বরাবরের মত নির্বিকার। তারা বলেন, অবিলম্বে সকল শ্রমিকদের এক মাসের মূল মজুরির সমান ঈদ বোনাস পরিশোধ করতে হবে। তারা আরও বলেন, শ্রমিকরা যাতে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয় সেটা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সমাবেশ থেকে ঈদের ছুটির পূর্বে কারখানাগুলোতে বোনাস ও বকেয়া পরিশোধে ব্যতিক্রম হলে আঞ্চলিকভাবে তাৎক্ষণিক কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়া হয়।

Thursday, August 24, 2017

তসলিমা নাসরিনের জন্মদিনের শুভেছা

অাজ ২৫ আগস্ট বাংলাদেশের একজন গুণী সাহিত্যিক ও চিকিৎসক তসলিমা নাসরিনের ৫৫ তম জন্মদিন । ১৯৬২ সালের ২৫ আগস্ট তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন।তার মা ইদুল আরা একজন গৃহিনী ও পিতা রজব আলী চিকিৎসক ছিলেন।
১৯৭৬ সালে তসলিমা ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হনএবং সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস পাশ করেন।১৯৮৬-১৯৮৯ সালে তিনি সরকারী গ্রামীণ হাসপাতালে এবং ১৯৯০-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিভাগে ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তসলিমা সাহিত্য আন্দোলন, নারী অধিকার, মানবাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। একাধারে কবি, কলামিস্ট, ঔপন্যাসিক তসলিমা নাসরিন বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তার লেখার অনেক ভক্ত রয়েছে একইসঙ্গে তার প্রতি বিরাজভাজন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। ইসলাম, হিন্দু, খিস্ট্রান, ইহুদি বিভিন্ন ধর্মনিয়ে কটাক্ষ করে লেখা ছাপা হওয়ায় ধর্মীয় অনুরাগী ব্যক্তিরা তার উপর খুবই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকেন।
তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে - নির্বাচিত কলাম, যাবো না কেন? যাব, নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প, ছোট ছোট দুঃখ কথা, নারীর কোনদেশ নেই, নিষিদ্ধ, অপরপক্ষ, শোধ, নিমন্ত্রণ, ফেরা, লজ্জা, ভ্রমর কইও গিয়া, ফরাসি প্রেমিক প্রমুখ। (সূত্র : উইকিপিডিয়া)।

বামপন্থি নেতৃবৃন্দের সরকারের প্রতি আহবান, বন্যাদুর্গতদের পর্যাপ্ত ত্রাণ দাও, ত্রাণের টাকা লুটপাট বন্ধ কর


  দেশের ব্যাপক অঞ্চল বন্যার পানিতে ভাসছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত। একদিকে বানভাসি দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অপরদিকে বামপন্থি দলের কর্মীরা জনগণের কাছ থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে পুলিশ বাহিনী ও সরকার দলীয় কর্মীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাতে বাঁধা প্রদান করছে। বন্যা ত্রাণে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে, ঈদের আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস পরিশোধ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার দেশব্যাপী আহত বিক্ষোভ সমাবেশের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে বামপন্থি নেতৃবৃন্দ উপরোক্ত বক্তব্য রাখেন। 


২৪ আগস্ট ২০১৭  বিকাল সাড়ে চারটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)র সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মাকর্সবাদী)র কেন্দ্রীয় নেতা জহিরুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়ক আবুল হাসান রুবেল, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য কমরেড অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহবায়ক হামিদুল হক। সভা পরিচালনা করেন সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড সাজেদুল হক রুবেল।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, বন্যায় ইতোমধ্যে শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা বর্ণনাতীত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার এ দুর্ভোগের মধ্যেও এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধ থেকে রেহাই মিলছে না গ্রামের গরিবদের। নেতৃবৃন্দ সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে বন্যাদুর্গত মানুষদের পর্যাপ্ত ত্রাণ দিতে হবে। এনজিও ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিতের নির্দেশ দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী ফসলের জন্য পর্যাপ্ত বীজ, সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ী নির্মাণের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে সারাদেশে মহাসড়ক ও সড়ক বেহাল হয়ে পড়েছে। শত শত কিলোমিটার পথ চলাচলের জন্য অনপযুক্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে মানুষ তীব্র ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। নেতৃবৃন্দ বলেন কোরবানীর ঈদে শহরের অধিকাংশ মানুষ নিজেদের গ্রামে ফিরে যাবে। এসময় সড়কগুলোতে ব্যাপক চাপ পড়বে। বিধ্বস্ত সড়কের কারণে যানজট অসহনীয মাত্রায় পৌঁছবে। ঈদের আগে বিধ্বস্ত সড়ক সংস্কার করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য নেতৃবৃন্দ সরকারের প্রতি আহŸান জানান।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন হাওরে আগাম বন্যা ও দেশের বন্যা পরিস্থিতির অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্য শস্য বিশেষ করে চালের দাম বাড়িয়ে চলছে। এ মুহর্তে চালের দাম দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। সরকার চালের উপর আমদানীর শুল্ক ব্যাপক হ্রাস করলেও চালের দাম কমছে না। নেতৃবৃন্দ চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে হ্রাসের জন্য সরকারের উদ্যোগ দাবি করেন। নেতৃবৃন্দ বন্যার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহের দাবি জানান। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ ঈদের আগে গার্মেন্ট শ্রমিকসহ সকল শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্য মালিকদের প্রতি আহবান জানান।
বামপন্থি নেতৃবৃন্দ নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন, বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণের দাবিতে এবং ত্রাণ সামগ্রী লুটপাটের বিরুদ্ধে জনগণকে সাথে নিয়ে বিক্ষোভ, ঘেরাও, গণসংগ্রাম গড়ে তুলুন।
সমাবেশে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতারকৃত সিপিবি নেতা শ্যামল দে, আমির হোসেনসহ চট্টগ্রামে ১৩ জন শিক্ষক এবং কক্সবাজারে ৫৭ ধারায় গ্রেফতারকৃত যুব ইউনিয়ন নেতা জসিম আজাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করা হয়।সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।

ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত

সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে শ্রমিকদের আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল, ক্যান্টিন ও ইউনিয়ন (সিবিএ) কার্যালয় স্থাপনসহ জরুরী সকল সুযোগ সুবিধা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা এবং কর্মরত সকল শ্রমিকদেরকে প্রতিমাসে ৩,০০০/- টাকা করে অন্তর্বর্তী ভাতা প্রদানের দাবিতে আজ ২৪ আগস্ট ২০১৭ তারিখ বৃহস্পতিবার সকাল ১০.৩০ মিনিট থেকে ১২.০০ টা পর্যন্ত হেমায়েতপুর, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়নের সভাপতি জনাব আবুল কালাম আজাদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত শ্রমিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক, সহ-সাধারণ সম্পাদক টি এম লিয়াকত হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক হাদিউল ইসলামসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। 

সভাপতি আবুল কালাম আজাদ তার বক্তব্যে বলেন, ট্যানারীর মালিকরা ষড়যন্ত্র করছেন পুরনো শ্রমিকদেরকে চাকুরীচ্যুত করে কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে নতুন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো। অথচ মালিকদের সাথে আমাদের দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি আছে কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কোন কাজ করানো হবে না। চুক্তি অনুযায়ী কন্ট্রাক্টরী প্রথা যদি বন্ধ করা না হয় তাহলে আমরা যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হবো। মালিকদের ষড়যন্ত্র এবং কতিপয় দালালদের অপচেষ্টা ট্যানারীর শ্রমিকরা কোনদিনও সফল হতে দেবে না। 

সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক বলেন, ট্যানারী স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শ্রমিকরা। থাকা, খাওয়া, যাতায়াতসহ সর্বক্ষেত্রে শ্রমিকরা চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। জীবন যাত্রার ব্যয় দ্বিগুন বেড়ে যাওয়ায় ট্যানারী শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই শ্রমিকদের দুর্দশা লাঘবের জন্য মালিকদের নিকট আমাদের দাবি হলো কর্মরত সকল শ্রমিককে প্রতিমাসে ৩,০০০/- টাকা করে অন্তর্বর্তী (এডহক) ভাতা দিতে হবে। 

সভা থেকে কোরবানী ঈদের পূর্বেই শ্রমিকদেরকে এডহক ভাতা প্রদান, শ্রমিকদের ইউনিয়ন (সিবিএ) কার্যালয় স্থাপন ও ক্যান্টিন চালু করার দাবি জানানো হয় এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শ্রমিকদের আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল, মসজিদসহ জরুরী সকল বিষয়টি বাস্তবায়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন চামড়া শিল্প নগরীতে পর্যাপ্ত বাতি লাগানো, রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। জরুরী এইসব দাবি পূরণ না হলে চামড়া শিল্পের বৃহত্তর স্বার্থে কোরবানী ঈদের পর আরো বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। সভা শেষে এক বিক্ষোভ মিছিল চামড়া শিল্প নগরীর বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে।

Wednesday, August 23, 2017

মুক্তিযুদ্ধেও যে পতাকা আজ ভূলুন্ঠিত



লেখকঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
"সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার" কালজয়ী বাণী নিয়ে ফরাসী দেশের বিকাশমান বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে ১৭৮৯ সালে ঐতিহাসিক "ফরাসী বিপ্লব" সংগঠিত হয়েছিল। পতন হয়েছিল বাস্তিল দূর্গের। অবসান হয়েছিল সামন্তবাদের। কিন্তু বুর্জোয়ারা অচিরেই সেই বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। "সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার" সেই বাণীকে ও বিপ্লবের পতাকাকে তারা পরিত্যাগ করে ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছিল। প্রায় ১০০ বছর পর সে দেশের শ্রমিক শ্রেণি ঘোষণা দিয়ে বলেছিল- বুর্জোয়াদের পরিত্যাগ করা "সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার" বাণীকে আমরা হাতে তুলে নিলাম, সে পতাকাকে আমরা সর্বহারা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করবো। ১৮৭১ সালে তারা শ্রমিক রাষ্ট্র "প্যারি কমিউন" প্রতিষ্ঠা করে সেই পতাকাকে পুনরায় উড্ডীন করেছিল।
বাংলাদেশে অনেকটা ফরাসী দেশের ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে "জাতীয়তাবাদ-সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতার" বাণী নিয়ে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। দেশে এখনো বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন চলছে। কিন্তু শাসক বুর্জোয়া দলগুলো সেই বাণী তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারাকে পরিত্যাগ করে তাকে ধুলায় নামিয়ে দিয়েছে। ভূলন্ঠিত সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারা ও পতাকাকে আবার উড্ডীন করার দায়িত্ব এখন ঐতিহাসিক কারণে এসে পড়েছে এদেশের মেহনতি শ্রেণির ওপর। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধের নতুন আরেক অধ্যায় রচনার।
জাতি হিসেবে এ যাবৎকাল পর্যন্ত আমাদের গৌরব করার মতো যতকিছু আছে, তার মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করে আছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের বিজয়ী গৌরবগাঁথা। চার দশকের বেশি অতিবাহিত হওয়ার পরেও জাতি সেই গৌরবের তিলক, বিজয়ের অমূল্য চিহ্ন হৃদয়ে ধারণ করে চলেছে। একাত্তর আমাদেরকে বিজয় দিয়েছে, গৌরব দিয়েছে। সেই বিজয়-গৌরব ম্লান হবার নয়। ম্লান হয় নি কিছুমাত্র।
কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চম দশকে পদার্পণ করার পরেও জাতি আজ কঠিন এক প্রশ্নের সম্মুখীন। একাত্তরের অমূল্য বিজয়ের সেই গৌরবের সুধা কি জাতি ধরে রাখতে পেরেছে? অমূল্য বিজয়ের সেই ফসল কি দেশবাসীর ঘরে ঘরে তুলে দেয়া সম্ভব হয়েছে? এই প্রশ্নের দ্ব্যর্থহীন জবাব হচ্ছে, না! এই না পারার মধ্যেই পরাজয়ের গ্লানি, হতাশার দুঃখবোধ দেশের মানুষকে দংশন করে চলেছে।
এই গ্লানি আর দুঃখবোধের জন্য কিন্তু একাত্তরের বিজয় দায়ী নয়। দায়ী একাত্তর পরবর্তী প্রায় চার দশকের ঘটনাবলী। ইতিহাসের মাপকাঠিতে বিচার করে একথা স্বীকার করে নিতে হয় যে, একাত্তরের অর্জিত বিজয়সম্ভারকে আরো সমৃদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারাকে দৃঢ়মূল করা তো দূরের কথা, সে দিনের বিজয় ও সাফল্যগুলোকে পরিপূর্ণভাবে ধরে রাখাটাও সম্ভব হয় নি। আরো এগিয়ে যেতে না পারাটা নিঃসন্দেহে বেদনাবহ, কিন্তু কিছু একটা অর্জনের পরেও তা ধরে রাখতে না পারার গ্লানি ও যন্ত্রণা অপরিসীম। জাতির জন্য এটা একটা কলঙ্ক। সেই কলঙ্ক মোচনের কাজটিই এখনো জাতির সামনে প্রধান কর্তব্য হিসেবে বিরাজ করছে।
একাত্তরের বিজয়ী মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংগঠিত হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠিত ও প্রগতির পথে বিকশিত হওয়ার অমূল্য সুযোগ এনে দিয়েছিল। বিজাতীয় শক্তির ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে আমরা সেদিন যে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, সেই রাষ্ট্রে সাম্য, মৈত্রী, শোষণমুক্তি, শান্তি, স্বাধীনতা ও প্রগতির পথে নবজীবনের সূচনা করার পথ তৈরি হয়েছিল। জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছিল যুগান্তকারী পটপরিবর্তন সাধন করে নবযুগ সূচনার বাস্তব সম্ভাবনা।
বাঙালি জাতির দীর্ঘকালের গণসংগ্রামের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মরণপণ প্রত্যয় ও দেশবাসীর সম্মিলিত আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আমরা আমাদের দেশের সংবিধান রচনা করেছিলাম। বাহাত্তরে রচিত সেই সংবিধানে ভাষা ও রূপ পেয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা ও ধারা। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চার নীতিকে ঘোষণা করা হয়েছিল রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে।
ঘোষণা করা হয়েছিল যে, এই চারটি নীতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
আত্মশক্তির উপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন জাতীয় বিকাশের ধারায় দেশকে এগিয়ে নেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে "জাতীয়তাবাদ"-কে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই জাতীয়তাবাদের প্রত্যয়ের মাঝে ছিল গভীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান। যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে, যার ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণ-শাসনের জিঞ্জির ভেঙে আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলাম, সেই পাকিস্তান ছিল আমেরিকাসহ বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পদলেহী একটি রাষ্ট্র। সাম্রাজ্যবাদ তার "ভাগ কর-শাসন কর" নীতি অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে, ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে, প্রতিক্রিয়াশীল দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তানের সৃষ্টি সম্ভব করে তুলেছিল। এই কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্মের আগে থেকেই "পাকিস্তান আন্দোলন"- এর জন্ম দেয়া হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রমূলক খেলার একটি অংশ হিসেবে। রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সেই পাকিস্তান রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-সামরিক আধিপত্যবাদী স্ট্র্যাটাজির একটি প্রধান হাতিয়ার। সিয়াটো, সেন্টো ও বিভিন্ন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বদৌলতে পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল বিশ্বের এই অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি সামরিক ও রাজনৈতিক আউটপোস্ট। পাকিস্তান পরিণত হয়েছিল মার্কিন ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অবাধ শোষণের লীলাক্ষেত্রে।
অনেকদিন পর্যন্ত বুর্জোয়া-জাতীয়তাবাদী কোনো কোনো রাজনৈতিক মহল এমন একটি ভ্রান্তি ও মোহে আচ্ছন্ন ছিল যে, সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর কাছে তদবির ও দেন-দরবার করে বাঙালির স্বাধিকার আদায় করে নেয়া যাবে। যেভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের তোয়াজ করে ও তাদের ষড়যন্ত্রের সহযোগী হয়ে ভারত ভেঙে আদায় করা সম্ভব হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানের বাস্তবতাই ছিল এমনই যে, তাকে নিয়ে বেচা-কেনা করার সুযোগ সাম্রাজ্যবাদের ছিল না। তাই দেন-দরবারে কাজ হয় নি। স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র তুলে নিতে হয়েছিল। পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটির পাশাপাশি একই সাথে প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়াই করতে হয়েছিল আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে পদানত, নতজানু, নির্ভরশীল ও অনুগত হয়ে চলার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংঘাতে গিয়ে, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে, সেই শক্তিকে পরাভূত করেই বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল। একাত্তরের সংগ্রাম পরিণত হয়েছিল বাঙালি জাতির সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়-মুক্তির সংগ্রামে। এই জাতীয় মুক্তির অন্তর্নিহিত মর্মবাণীকে অবলম্বন করেই মুক্তিযুদ্ধের "জাতীয়তাবাদকে" অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি রূপে সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়েছিল।
জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সে পথেই শুরু হয়েছিল নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রা। কিন্তু বুর্জোয়া শাসকদল ছিল এই নীতি ধরে দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে দুর্বল ও দোদুল্যমান চরিত্রের। তাতেও সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে এই নীতি ও পথ সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে উল্টো পথে যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। দেশকে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের সাথে বেঁধে ফেলে এদেশকে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার পরিপন্থী সেই ভ্রান্ত পথ ধরেই আজও দেশ অগ্রসর হচ্ছে। দেশের প্রধান বুর্জোয়া দলগুলো সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনে পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে।
পাকিস্তান ছিল সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী-একনায়কত্ববাদী ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্র। ভাষার অধিকার, সার্বজনীন ভোটাধিকার, নির্বাচিত সরকার দ্বারা দেশ পরিচালনা করার অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহের গ্যারান্টি- পাকিস্তানে এসব ছিল নির্বাসিত। সত্তরের নির্বাচনের গণরায়কে কার্যকর হতে যখন বাঁধা দেয়া হলো, তখনই গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশ। নির্বাচনের গণরায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসন পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহের অলঙ্ঘনীয় নিশ্চয়তা, আইনের শাসন, নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থা, পূর্ণ কর্তৃত্ববান নির্বাচিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, ভূমি সংস্কার, সকল নাগরিকের জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থানের নিশ্চয়তা, বৈষম্যের অবসান ইত্যাদি নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতন্ত্রায়নের পথে সুনির্দিষ্ট নীতি ও পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল সংবিধানে। সেসব ব্যবস্থার আলোকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি রূপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল "গণতন্ত্র"।
কিন্তু গণতন্ত্রের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় করার প্রয়াসে শুরু থেকেই ছিল দুর্বলতা। আর, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যে পরিবর্তন ঘটানো হয়, তারপরে কয়েক দফায় চলেছে সরাসরি কিংবা বেসামরিক লেবাসে সামরিক বাহিনীর শাসন-কর্তৃত্ব। বছরের পর বছর ধরে লালিত হয়েছে স্বৈরাচারের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তি। নব্বইতে রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরশাসন উচ্ছেদ করে নির্বাচিত বেসামরিক সরকার ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের ধারা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও গণতন্ত্র নিরঙ্কুশ করা সম্ভব হয় নি। স্বৈরাচারের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তির মূল উপাদানগুলো এখনো বহাল রাখা হয়েছে। চলছে লুটপাটের অর্থনীতি, লুটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সংঘাত, অপরাধমূলক কুৎসিত সব অপরাজনীতির খেলা, রাজনীতিতে নমিনেশন বাণিজ্য-টাকার খেলা-ক্যাডার লালন ইত্যাদির রোগাক্রান্ত দাপট এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের আধিপত্য। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা এখনো দূর হয় নি। গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ক্রমাগত খর্বিত হচ্ছে। বুর্জোয়া দলগুলোর হাতে গণতন্ত্র নিরাপদ নয়। সর্বত্র চলছে নৈরাজ্য। "অস্থিতিশীলতা"ই এখনো হয়ে রয়েছে জাতীয় জীবনের সবচেয়ে স্থিতিশীল বৈশিষ্ট্য।
পাকিস্তানি আমল থেকেই দেশবাসীকে সংগ্রাম করতে হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভট পাকিস্তানি মতাদর্শের বিরুদ্ধে। বাঙালি জাতির নিজস্ব জাতীয় আত্মপরিচয়ের উপলব্ধি ও জাতিগত জাগরণের মধ্য দিয়ে এই উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ধর্ম আলাদা-আলাদা হলেও জাতি হিসেবে পরিচয় প্রায় সর্বাংশেরই এক, তা হলো বাঙালি। তাই বাঙালির জাতি-রাষ্ট্রে ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকারকে বিভাজিত করার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। এই নীতিরই স্বাভাবিক আরেকটি প্রত্যয় হলো- এদেশের আদিবাসীরাসহ সব জাতি-বর্ণ নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকরা সমান মর্যাদাসম্পন্ন। হিন্দু-মুসলমান, আমির-ফকির, বাঙালি-আদিবাসী নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সামনে সব নাগরিকই সমান অধিকার ও মর্যাদা সম্পন্ন। "ধর্ম যার-যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার" -এই নীতি নিয়ে বহুকাল ধরে সংগ্রাম হয়েছে। এটাই রাষ্ট্রনীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতা বলে পরিচিত। পাকিস্তানের মতো ধর্মভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি অনুসরণ করে দেশ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় নি। পাকিস্তানি আদর্শে রচিত দ্বিখন্ডিত এক "বাংলাস্থান"রূপী নব্য পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য শহীদরা বুকের রক্ত ঢালে নি। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয় ছিল স্পষ্ট। স্বাধীন বাংলাদেশ চলবে অসাম্প্রদায়িক ধারায়। সেই অনুসারে সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় "ধর্মনিরপেক্ষতা"-কে।
কিন্তু সে পথে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয়নি। পঁচাত্তরের পর সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, পাকিস্তানি ভাবাদর্শ প্রভৃতিকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাজকর্মে প্রবেশ করানো হয়েছে। শুধু সাম্প্রদায়িক অপশক্তিই নয়, উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী কালোশক্তিকেও ভিত রচনার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি করে বিপজ্জনক অন্ধকারের কালোশক্তির থাবার বিস্তারই কেবল ঘটেনি, সাম্প্রদায়িক মনোভাব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রসারিত হয়েছে। কয়েকটি বুর্জোয়া দল তাদেরকে মদত দিচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িকতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এই বিপদের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনায় বুর্জোয়া শ্রেণি ও তাদের অন্যান্য দলগুলো ব্যর্থ। জনগণের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-প্রগতিবাদী চেতনা সৃষ্টির জন্য ভাবাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলন পরিচালনার কাজের ক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থ।
পাকিস্তান রাষ্ট্র ছিল সাম্রাজ্যবাদ, একচেটিয়া পুঁজি ও সামন্তবাদের নিয়ন্ত্রিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় পরিচালিত। পূর্ব বাংলায় ধ্রুপদী সামন্তবাদের অস্তিত্ব সে সময়কালে ততটা না থাকলেও, সামন্তবাদের অবশেষ হিসেবে নানা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। সাধারণ মানুষ জাতিগত শোষণের পাশাপাশি শ্রেণিগত শোষণে নিষ্পেষিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ তাই জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন সংগ্রামের পাশাপাশি হয়ে উঠেছিল বাংলার শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণই ছিল প্রশ্নাতীতভাবে প্রধান। শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে সাম্যের সমাজ নির্মাণের সংগ্রাম এদেশে পরিচালিত হচ্ছিল বহু বছর ধরে। সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল জনপ্রিয় স্লোগান। পাকিস্তানের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে সমাজতন্ত্রের ধারায় স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সংবিধানে তাই অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল "সমাজতন্ত্র"।
সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কোন্ ধরনের নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে তারও বিস্তারিত নির্দেশনা সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে কয়েকটি উদ্ধৃতি দিলেই দেশের অর্থনৈতিক নীতি-ব্যবস্থা সম্পর্কে সাংবিধানিক নির্দেশনা স্পষ্ট হবে। সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ের "রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি" প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।" মালিকানা সম্পর্কে বলা হয়েছে,- "উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা-ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে; (ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা; (খ) সমবায়ী মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা এবং (গ) ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা।" লক্ষণীয় যে, সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রাধান্য দিয়ে সমবায়ী ও ব্যক্তি মালিকানাকে আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধকৃত অবশিষ্টাংশ (residual)- হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তার পরপরই বলা হয়েছে যে, "রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে- কৃষক ও শ্রমিককে- এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি প্রদান করা।" কর্মসংস্থান ও কর্ম সম্পর্কে বলা হয়েছে, "কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং "প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী"- এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।" উল্লেখ্য যে, এখানে "প্রত্যেকের নিকট হইতে... কর্মানুযায়ী" কোটেশনের উদ্ধৃত অংশটি মার্কস-এঙ্গেলস রচিত "কমিউনিস্ট ইশতেহার" থেকে হুবহু উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই সংবিধানে আরো বলা হয়েছে, "রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং ... নাগরিকদের জন্য ... (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা।"
পঁচাত্তরে পর এইসব নীতি পরিত্যাগ করে অবাধ মুক্তবাজার নীতির ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদের পথ গ্রহণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি - উভয় বুর্জোয়া দলই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা বিরোধী এই অর্থনৈতিক দর্শন অনুসরণ করে চলছে। উভয় বুর্জোয়া দলের সরকারের সেই ধারাতেই অর্থনীতি চলছে।
"৭২-এর সংবিধান বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফসল। আর মুক্তিযুদ্ধ ছিল দীর্ঘ দু"যুগের সংগ্রামের ফসল। বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের সমগ্র চেতনা ও ধারার নির্যাস হলো "৭২-এর সংবিধান। এ সংবিধান কোনো রাজনৈতিক লেনদেন, গোপন শলাপরামর্শ অথবা সুযোগ-সুবিধার বিবেচনা থেকে প্রণীত হয় নি। এই সংবিধান গণমানুষের সংগ্রামের অমোঘ শক্তি এবং ইতিহাসের গতিপথের মিলিত রূপ। "৭২-এর সংবিধান বাংলার মানুষের ঐক্যের প্রতীক। বাংলার মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার সামগ্রিকতাকে ধারণ করেই এই সংবিধান রচিত হয়েছে। এটার একটি অখন্ড রাজনৈতিক চরিত্র রয়েছে। আর এই সংবিধানের মর্মবাণী নিহিত রয়েছে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, তথা- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম-নিরপেক্ষতার মধ্যে। এই চার নীতিকে কোনোভাবেই খন্ডিত করে আংশিকভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রীয় চার নীতিকে পরিত্যাগ করে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা থেকে বিপথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই চার নীতির ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনাটাই বর্তমানে জাতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং কর্তব্য। দৃঢ়তা ও নির্ভেজাল প্রত্যয়ের সাথে সেই কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়েই সোনার বাংলা গড়ার পথে দেশকে এগিয়ে নেয়া ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ফসল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হতে পারে।
একথা আজ প্রমাণিত যে দেশের বুর্জোয়া শ্রেণি ও তাদের রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারাকে কার্যত: পরিত্যাগ করেছে। বড় দুুটি বুর্জোয়া দলের নেতৃত্বই লুটেরা-বুর্জোয়াদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা বহন করার ক্ষমতা তাদের আর নেই। কিন্তু, লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত সেই কালজয়ী চেতনা-ধারা নিঃশেষ হবার নয়। তাহলে, বুর্জোয়ারা যে চেতনা-ধারাকে, যে "পতাকাকে" ভূলুণ্ঠিত করেছে তাকে আজ উর্ধ্বে তুলে ধরার স্বক্ষমতা রাখে কোন শ্রেণি? যে শ্রেণি হলো দেশের মেহনতি শ্রেণি। এই ঐতিহাসিক উপলব্ধি ধারণ করে শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি মানুষদের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ড জোরদার করা আজ বিশেষ জরুরি হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অজেয় পতাকার ভবিষ্যত এখন প্রধানত তাদের হাতে।
(২৪।৮।২০১৪)

শহীদ সঞ্জয় তলাপাত্র

শহীদ সঞ্জয় তলাপাত্র,ক্যাম্পাসের প্রমিথিউস
============================== 
শহীদ সঞ্জয় তলাপাত্র সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নাম।সঞ্জয়রা কোন দিন হারিয়ে যায় না। যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে সঞ্জয় তলাপাত্র'রা।তাঁদের স্মৃতি বেঁচে থাকে অনন্তকাল।
সঞ্জয় তলাপাত্র একমাত্র নিজের ইচ্ছায় অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। পাশাপাশি সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে যুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নে।
১৯৯৮-এর আগস্টের আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন। ফলে সেই সময়ে প্রায় প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আর রেল স্টেশনে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। ২০ আগস্ট। সেদিন সকালে বটতলী স্টেশনে মিছিলের কোন কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার পূর্বে হঠাৎ শিবির কর্মীরা রড, লাঠি আর বাঁশ নিয়ে হামলা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের।ফলে আহত হয় অনেক শিক্ষার্থী।
সেদিনের ঘটনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে বটতলী স্টেশনে বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি হামলার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বড় মিছিল করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেদিনের হামলার সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ ছিল স্টেশনে মৌলবাদী ঘাতকদের দ্বারা সঞ্জয়ের মারাত্মক আহত হওয়া।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সঞ্জয় খাতা আর তুলির ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সকালের শাটল ট্রেনে যেতে চেয়েছিল তার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু মৌলবাদী চক্রের লাঠি আর রডের আঘাতে তাকে আর ক্যাম্পাসে পৌঁছতে দেয়নি। সঞ্জয় তলাপাত্রকে রক্তাক্ত অবস্থাতে নিয়ে যেতে হয়েছিলো হাসপাতালে।
কিন্তু দীর্ঘ ৪৮ ঘন্টা ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২২ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে সঞ্জয় চিরতরে চলে যায়।থমকে যায় সময়। থেমে যায় একটি প্রাণবন্ত জীবন।অনেক বেশি কষ্টের বিষয় ছিল সেদিনের ২২ আগস্ট ছিল সঞ্জয় তলাপাত্রে'র ২৪ তম জন্মদিন।
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সঞ্জয়ের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছলে ১৪ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ক্ষোভে, ঘৃণায়, প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে আর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বলেছিল মাগো তোমায় কথা দিলাম, সঞ্জয় হত্যার বদলা নেব।’ 'সঞ্জয়ের ক্যাম্পাসে খুনী শিবিরের ঠাঁই নেই'সঞ্জয়ের আত্মত্যাগ সেদিন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস শিখিয়েছিল। কারণ দীর্ঘ ১২ বছরের অবরুদ্ধ ক্যাম্পাসকে সেদিন মুক্ত করার শক্তি যোগায় সঞ্জয়ের মৃত্যু। ১৪ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর সম্মিলিত প্রতিরোধে সঞ্জয়ের হত্যাকারী ঘাতকরা সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
এখন ২০১৭ সাল। দীর্ঘ এই ১৯ বছরেও সঞ্জয় হত্যার কোনো বিচার হয়নি। কি অপরাধ ছিল সঞ্জয়ের? অন্যায়ের প্রতিবাদ? হত্যাকরীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। এই খুনী শিবিরের বিরুদ্ধে আমরা কি বা করতে পেরেছি? সঞ্জয়ের মা এখনো ছেলের জন্মদিনে পায়েস তৈরি করেন। ছোট বোন শান্তা তলাপাত্র নিঃশব্দে কাঁদে প্রিয় ভাইটির জন্য। আর বাবা সঞ্জয়ের রেখে যাওয়া সামান্য স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।বার বার ভুলে যেতে চান সঞ্জয় নেই।
সঞ্জয় তলাপাত্র একটি অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসমুক্ত, শোষণহীন সমাজ চেয়েছিল। চেয়েছিল তার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন না থাকে কোন দখলদারিত্বের রাজনীতি। কিন্তু শিবিরের ঘাতকরা ভয় পেয়ে সঞ্জয়কে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে সঞ্জয়ের মৃত্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৪ হাজার ছাত্র-ছাত্রী মুক্ত করেছিল একযুগের অবরুদ্ধ চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে।সঞ্জয় হত্যা সহ সকল ছাত্র হত্যার বিচার চাই। লাল সালাম কমরেড সঞ্জয় তলাপাত্র।

Monday, August 21, 2017

শ্রম আইনে বোনাস ও মজুরী এবং তা পরিশোধের দায়িত্ব



লেখকঃ ড. উত্তম কুমার দাস
আমাদের দেশে (বেসরকারী পর্যায়ে) চাকরী-সংক্রান্ত বিষয়াবলী বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০১৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শ্রম আইন শ্রম (Labour) সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ে বিধান দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- নিয়োগ ও চাকরীর শর্তাবলী, কর্ম ঘণ্টা ও ছুটি, মজুরী ও তা পরিশোধ, কল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রভৃতি।
শ্রম আইনে মজুরীর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হল- টাকায় প্রকাশ করা যায় বা এমন সকল পারিশ্রমিক যা চাকরীর শর্তাবলী- প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই হোক না কেন যা শ্রমিককে তাঁর চাকরীর জন্য প্রদেয় হয় [শ্রম আইন, ধারা ২(৪৫)]।
আবার আরেক জায়গায় বলা হয়েছে- নিয়োগের শর্ত মোতাবেক প্রদেয় কোন বোনাস বা অন্য কোন অতিরিক্ত পারিশ্রমিকও মুজুরীর অংশ (শ্রম আইন, ধারা ১২০)।  
বোনাসঃ বোনাস বা ভাতা হল কোন কর্মীর জন্য তাঁর নিয়মিত মজুরীর অতিরিক্ত বাড়তি পাওনা। কোন প্রতিষ্ঠান কোন উপলক্ষ বা উৎসব পালন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন (যেমন- উৎপাদন), সময়ানুগ উপস্থিতি, নিষ্ঠার সংগে কর্ম সম্পাদন প্রভৃতির জন্য বোনাস দিতে পারে।
শ্রম আইনে বোনাসঃ যেসব শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ নিরবচ্ছিন্নভাবে এক বছর হয়েছে তাঁরা বছরে দুটি উৎসব ভাতা (বোনাস) পাবেন। প্রতিটি উৎসব ভাতার পরিমাণ মাসিক মূল মজুরীর অধিক হবেনা (শ্রম বিধি ১১১)।

মজুরী ও তা পরিশোধের দায়িত্বঃ শ্রম আইনের বিধান মোতাবেক, মালিক (নিয়োগকর্তা) তাঁর নিযুক্ত প্রত্যেক শ্রমিককে (এই আইনের অধীন পরিশোধযোগ্য) মজুরী পরিশোধ করতে দায়বদ্ধ। আমাদের এখানকার শ্রম আইন অনুযায়ী, মুজুরী হতে হবে মাসিক ভিত্তিতে। আর এই মাস শেষের সাত কর্ম দিবসের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে (ধারা ১২৩)। 
শ্রমিকের মজুরী মাসিক কিংবা অন্য কোনভাবে পরিশোধ করা হবে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে আগেই তা নোটিশ আকারে জানাতে হবে। একই সংগে কখন তা পরিশোধ করা হবে তাও জানাতে হবে।
একই নিয়ম বোনাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
অনাদায়ে প্রতিকারঃ শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরী ও অনান্য পাওনাদি অনাদায়ে আপোষ-মীমাংসা, মধ্যস্থতার আবেদন এবং শ্রম আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। একই বিধান বোনাস পরিশোধ না হলেও প্রযোজ্য হবে।
কোন শ্রমিক তাঁর পাওনা যথাসময়ে না পেলে কিংবা তা থেকে বে-আইনীভাবে কেটে রাখা হলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক তাঁর নিয়োগকারীকে লিখিতভাবে জানাতে পারবেন। তাঁর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি (যদি থেকে) তা করতে পারবে। এই ক্ষেত্রে নিয়োগকারীকে দাবী পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে (শ্রম বিধি ১১৩)।
এভাবে কোন ফল না পেলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শকের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করা যাবে। এইক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপসহ নিষ্পত্তির সময়সীমা ৫০ দিন (২০ + ৩০ দিন)। এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে বা গৃহীত সিদ্ধান্ত কোন পক্ষ না মানতে চাইলে ছয় মাসের মধ্যে তারা শ্রম আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। 
লেখক: শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এবং এডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ।
(মতামত লেখকের নিজস্ব, এর সঙ্গে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতার কোন সম্পর্ক নেই)।