Biplobi Barta

Monday, September 11, 2017

সালভাদর আলেন্দে

পুরো নাম সালভাদর গুইলারমো আলেন্দে গোসেনস। স্কুলজীবন থেকেই তিনি রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। সমাজের অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহন করেও সাধারণ মানুষ চারপাশের সমস্যা তাঁকে পীড়িত করতো। জন্মস্থান ভারপারাইসোতে সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠনের তিনি ছিলেন অন্যতম রূপকার।
আলেন্দে প্রথম লাতিন আমেরিকান মার্ক্সবার্দী কমিউনিস্ট নেতা, যিনি ১৯৭০ সালে উন্মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির ২৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণ করে আলেন্দে শিল্প জাতীয়করণ এবং সম্মিলিত কৃষি চাষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দেশের সমাজতান্ত্রিক বিরোধী লুটেরা মার্কিন দালাদদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে চিলির সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায়। সেনারা লা মনেদা প্রাসাদ ঘিরে আক্রমন করলে আলেন্দে আর্তসমর্পন করতে অস্বীকার করে লড়াই করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন। আদেন্দের হত্যাকাণ্ড বিভিন্ন দেশে মার্কিন মদদে বামপন্থি নেতাদের হত্যায় মার্কিনিদের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
আলেন্দে তাঁর মৃত্যুর আগে এক বেতার ভাষণে বলেন, ’আমার দেশের কর্মীরা, চিলি এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার আস্থা আছে। অন্যরা এই অন্ধকার ও তিক্ত মুহূর্তের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। মনে রাখবেন, আজ অথবা কাল, আমাদের পথ আবার মুক্ত হবে, যেখানে মুক্ত মানুষরা একটি শ্রেয় সমাজ গড়ে তুলবে। চিলি দীর্ঘজীবী হোক, জনগণ দীর্ঘজীবী হোক, শ্রমিকরা দীর্ঘজীবী হোক।’
কমরেড আলেন্দের জীবন থেকে আমরা এটাই শিখলাম- লুটেরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আর্তসমর্পনের চাইতে লড়াই করতে করতে মৃত্যুই প্রকৃত মানুষের জীবন। কমরেড আলেন্দে লাল সালাম। আজকে কমরেড আলেন্দের স্বপ্ন সফল হয়ে- চিলিতে বাম্পপন্থি সরকার অধিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর অপূরণীয় স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে।

পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণের প্রতিবাদসহ নানা দাবিতে-১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান ও সমাবেশ

Image may contain: 1 person, sitting, table and indoor
পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ, গুরুত্বপূর্ণ ও প্রগতিশীল লেখকদের লেখা বাদ দেয়াসহ নানা অসঙ্গতির প্রতিবাদসহ কয়েক দফা দাবিতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবসে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে প্রগতিশীল বিভিন্ন ছাত্র, যুব, নারী, শিশুকিশোর, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের যুথবদ্ধ মঞ্চ- জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন। গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র টিচার্স লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন-এর যুগ্ম আহবায়ক কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আন্দোলন-এর সদস্য সচিব ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জীবন ও জগত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও সমকালীন বিশ্বের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে অবগত, দেশপ্রেমিক, দক্ষ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই শিক্ষার লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্যে পোঁছানোর মূল সোপান হচ্ছে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি। কিন্ত, এবছর মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় ও লৈঙ্গিক বৈষম্যমূলক নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গণতন্ত্রমনা-প্রগতিশীল লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ লেখা বাদ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও এই পাঠ্যবইগুলোতে ছাপার ভুল, বাক্য গঠনে ভুল, তথ্য বিকৃতি, বানান ভুলসহ নিম্নমানের ছাপা ও নিম্নমানের উপকরণ বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ভুলগুলো বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। এর প্রতিবাদে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক-বুদ্ধিজীবী মহলসহ প্রগতিশীল সকল সংগঠনসমূহ ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করেছে যা এখনও অব্যাহত আছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কেউ এর দায় স্বীকার করেনি, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা এবং আগামী বছরের পাঠ্যপুস্তকে কি হবে সেটা নিয়ে স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সমাধানের উপায় না খুঁজে একে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করছে।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, একটা জাতিকে ধর্মান্ধ, কুপমণ্ডুক করে গড়ে তুলতে, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-জাতি ইত্যাদি ভেদাভেদ তৈরিতে যে ধরনের সিলেবাস প্রয়োজন, হেফাজতে ইসলামি বা জামাতে ইসলামি বা আওয়ামী ওলামা লীগ যে ধরনের সিলেবাসের দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের চ্যাম্পিয়ন বলে দাবিদার দল আওয়ামী লীগ সেই কাজটিই করেছে। যা সংবিধানের শিক্ষা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থি। যে লেখাগুলোর মধ্যে সাহিত্যরস আছে, যে লেখাগুলো অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখায়, দেশপ্রেম শেখায়, যুক্তিবাদী বা বিজ্ঞানমনষ্ক হতে শেখায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে সে লেখাগুলো বাদ দেয়া হয়েছে। যেন বাংলা সাহিত্যের বইকেও ধর্ম বই বানাতে ঐকান্তিক চেষ্টা। ফলে রচনাশৈলী, বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে রচনাকারের ধর্মপরিচয়ই প্রধান হয়ে উঠেছে। বাদ দেয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়, লালন শাহ, রণেশ দাসগুপ্ত, হুমায়ুন আজাদসহ বিখ্যাত লেখকদের লেখা। যার মধ্য দিয়ে সরকার মৌলবাদীদের অযৌক্তিক দাবির কাছে আত্মসমর্পন করে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর চেতনা বিকাশে প্রতিকূল ভূমিকা পালন করছে।
ইমরান হাবিব রুমন আরো বলেন, সাম্প্রদায়িক ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতের প্রণীত পাঠ্যপুস্তকের প্রতিবাদে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর সাম্প্রদায়িক-পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এদেশে প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবী-অভিভাবকসহ ছাত্র-যুব-নারী-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ দীর্ঘদিন থেকে লড়াই সংগ্রাম করে আসছে। এই লড়াইগুলোকে একত্রিত করে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. অজয় রায় এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীকে যুগ্ম আহবায়ক করে ‘জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন’ নামে ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ গড়ে তোলা হয়েছে। আগামীতে জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে আন্দোলন ও সাংগঠনিক রূপরেখা সবার সামনে তুলে ধরা হবে।
আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান ও সমাবেশে শিক্ষক-শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবী-অভিভাবকসহ ছাত্র-যুব-নারী-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন-এর অন্যান্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রণীত পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে, প্রগতিশীল গণতন্ত্রমনা লেখকদের লেখাগুলো যুক্ত করে মানসম্মত, চিত্তাকর্ষ পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা; সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, একই ধারার গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা; শিক্ষার সকল স্তরে বেসরকারীকরণ-বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা; চারু ও কারুশিক্ষা বন্ধের ষড়যন্ত্র বন্ধ কর। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মূল বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং অবিলম্বে ডাকসুসহ ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন-এর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উদীচী’র সভাপতি ড. সফিউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আদনান রিয়াদ, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসু, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জি এম জিলানী শুভ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা, বিপ্লবী ছাত্র শৈত্রীর যুগ্ম আহবায়ক ইকবাল কবীর, ছাত্র ঐক্য ফোরামের যুগ্ম আহবায়ক সরকার আল ইমরান, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স, স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আমিনুল আকরাম এবং সংস্কৃতি কর্মী জয়ন্ত জীবন উপস্থিত ছিলেন...

Sunday, September 10, 2017

রাখাইনে সহিংসতার কারণ জানালেন রুশ বিশেষজ্ঞরা

 
মিয়ানমারের রাখাইনে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হওয়া সহিংসতার পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত দুই কারণই রয়েছে বলে মনে করছেন রুশ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাখাইনে ভূ-রাজনৈতিক বহুমাত্রিক সংকটের কারণেই এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের দ্য সেন্টার ফর সাউথইস্ট এশিয়ার পরিচালক দিমিত্রি মস্কোভ রাশিয়ার সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন আরটি’কে দেওয়া এক সাক্ষাকারে বলেছেন, রাখাইনে বুদ্ধমতালম্বী ও মুসলমানদের মধ্যে শুরু হওয়া সংখাতের পেছনে বহির্বিশ্বের কিছু খেলুড়ে সরাসরি ইন্ধন জুগিয়েছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিকের রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তিন কারণে এ সংঘাত হচ্ছে বলে মনে করেন দিমিত্রি মস্কোভ। প্রথমত, এটি চীনের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র; কারণ আরাকানে চীনের অনেক বড় বিনিয়োগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মুসলমান চরমপন্থীদেরকে উস্কে দেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র। তৃতীয়ত, আসিয়ানভুক্ত জোটের মধ্যে বিরোধ (মিয়ানমার ও মুসলিম শাসিত ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে) বাধানোর একটি প্রচেষ্টা।
মস্কোভের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার জন্য বাইরের শক্তি কাজ করছে। বিশেষত সমুদ্র তীরবর্তী রাখাইন রাজ্যের হাইড্রোকার্বনের (তেল-গ্যাস জ্বালানি) বিশাল ভাণ্ডার এর অন্যতম কারণ।
তিনি আরো বলেন, সেখানে এমনিতেই বিশাল একটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। তার ওপর আবার তেল এ রাজ্যকে আরো মূল্যবান করে তুলেছে।
২০০৪ সালে রাখাইনে জ্বালানি সম্পদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর মিয়ানমার চীনের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আর সেই সূত্রধরেই ২০১৩ সালের মধ্যে চীন দেশটির ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহর থেকে মিয়ানমারের কুওকফিও বন্দর পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরি করে। পাইপলাইনটি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে অপরিশোধিত তেল আনতেও সাহায্য করছে। যে পাইপলাইন দিয়ে মিয়ানমারের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা থেকে হাইডোকার্বনও স্থানান্তরিত হচ্ছে। চীন-মিয়ানমারের এ প্রকল্পের অধীনে পাইপলাইনটি তৈরি করার সময় ২০১১-১২ সালের দিকে প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা রক্তপাত থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটির স্টাটিজেন্সি স্টাডিজের ডেপুটি ডিরেক্টর দিমিত্রি ইগোরচেনকভের মতে, এটি একটি কাকতালীয় ঘটনা। তবে রোহিঙ্গা সঙ্কটের পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ কারণ রয়েছে, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিরাগত কোনো দেশের দ্বারাও অনুপ্রাণিত হতে পারে।
মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা চীনের জ্বালানি প্রকল্পে প্রভাব পড়বে এবং এই ফাঁকে অন্য কোনো দেশ এই সুযোগ নিতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিবেশী দেশ উত্তর কোরিয়ার মধ্যে চলমান সংকটের কারণে বেইজিং শীঘ্রই বিপদে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি মনে করেন, হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন বিনিয়োগকারী জর্জ সরোসের অর্থায়নে পরিচালিত কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত বার্মা টাস্কফোর্স ২০১৩ সাল থেকে সক্রিয়ভাবে মিয়ানমারে কাজ করছে। অবশ্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জর্জ সরোস হস্তক্ষেপ করছেন আরও আগে থেকে। মিয়ানমারে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পট পরিবর্তনের জন্য অন্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয় বাড়াতে ২০০৩ সালে একটি মার্কিন টাস্কফোর্স গ্রুপের সঙ্গে যোগ দেন জর্জ সরোস।
দ্য কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স (সিএফআর) এর ২০০৩ সালের নথির বরাত দিয়ে স্পুটনিক জানায়, ‘বার্মা : টাইম ফর চেঞ্জ’ শিরোনামের ওই নথিতে ওই টাস্কফোর্স গ্রুপ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়া গণতন্ত্র টিকতে পারে না।’ আরটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইন্সটিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্রোগনোসিস অ্যাট দ্য পিপল’স ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অব রাশিয়া এর উপ পরিচালক দিমিত্রি এগোরচেনকভ বলেন, ‘যখন জর্জ সরোস এদেশে আসেন অথবা ওই দেশে যান ... তখন তিনি ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা সামাজিক বৈপরীত্য খুঁজতে থাকেন এবং এগুলো থেকে যেকোনও একটিকে বেছে নেন কিংবা এগুলোর মিশ্রণ তৈরি করেন এবং তাদেরকে উষ্ণ করে তোলার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে মোসিয়াকভের মতে, বিশ্বের কিছু প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির দেশ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ উত্তেজনায় মদদ দিয়ে সেইসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লাগাম টেনে ধরতে চায়। আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দিয়ে সার্বভৌমত্বের দেশগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং চাপ তৈরি করতে চায়।

রোহিঙ্গাদের বাঁচাও, বিশ্ববিবেক জাগাও-গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারকে বাধ্য কর


বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার নেতৃবৃন্দ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, নির্যাতন, ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে বিশ্ববিবেক জাগিয়ে তুলতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে হবে। 
রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধ ও রোহিঙ্গাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে বামপন্থি দলগুলোর আহবানে ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ-সমাবেশে নেতৃবৃন্দ এ আহবান জানান। সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড মো. শাহ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড আকবর খান, বাসদ-এর কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক কমরেড জোনায়েদ সাকি, বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড আব্দুস সাত্তার, সিপিবি’র সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাসদ-এর কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহবায়ক কমরেড হামিদুল হক প্রমুখ। সমাবেশটি পরিচালনা করেন ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড নজরুল ইসলাম। 
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে নির্যাতন হচ্ছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের সকল সহিংসতাকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশেষ করে ভ‚-রাজনৈতিক কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চলছে। বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থের আঘাত পড়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা শক্তি তাদের সংকীর্ণ অর্থনৈতিক ও ভ‚-রাজনৈতিক স্বার্থে বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছে। মানবিক করণীয়ের বোঝার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের বিপজ্জনক অভিঘাত সবটাই এসে পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। জঙ্গি সন্ত্রাসবাদীরাও সুযোগ নিচ্ছে। 
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলার জন্য যা যা করা দরকার, বাংলাদেশ সরকারের তার সবটাই করা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমস্ত জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা। জনগণের ঐক্যকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাও প্রয়োজন। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। উপরন্তু সরকারের কিছু কিছু বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও ক‚টনৈতিক তৎপরতার ক্ষেত্রে সরকারের চরম ব্যর্থতা দেশবাসীকে চরম হতাশ করেছে। 
জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয় ভ‚মিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তা মেনে নেয়া যায় না। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক-এ সত্যকে মেনে নিয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগে কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের নাম নিবন্ধন করতে হবে এবং তাদেরকে গ্রহণ করতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে বিশ্বজনমত সৃষ্টি করতে হবে।
রোহিঙ্গা সমস্যাকে মূলধন করে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকালী শক্তি যাতে অশুভ অভিসন্ধি কার্যকর করতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি নেতৃবৃন্দ আহবান জানান। 
সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুরনো পল্টনে এসে শেষ হয়।
রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে বামপন্থি নেতৃবৃন্দের টেকনাফ যাত্রা 
আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করার জন্য সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আজ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ঢাকা থেকে টেকনাফের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। নেতৃবৃন্দ সেখানে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের খোঁজ-খবর নেবেন এবং তাঁদের সঙ্গে কথা বলবেন।

Saturday, September 9, 2017

ঘুষ-দুর্নীতি কি শেষ হবে না


লেখকঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
ঘুষ-দুর্নীতি এমনভাবে মহামারী আকারে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে যে, তা এখন অনেকটাই ডাল-ভাতের মতো ‘স্বাভাবিক’ বিষয় হয়ে উঠেছে। সবাই এখন একই সঙ্গে ‘ঘুষ-গ্রহণকারী’ ও ‘ঘুষ প্রদানকারী’ হয়ে উঠেছে। পরস্পর পরস্পরকে ঠকাচ্ছে। কিন্তু ‘যুগপৎ ঠকিয়ে ও ঠকে’ সাধারণ মানুষদের মধ্যে কেউই লাভবান হতে পারছে না। তবে ঘুষের সর্বব্যাপী প্রসারের দূষিত পরিস্থিতির আড়ালে শুধু কিছু ‘রাঘববোয়াল’ লুটের ভা-ার গড়ে তুলছে। এদিকে অর্থমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, দেশে কোনো ঘুষ-দুর্নীতি নেই, যা আছে তা হলো একটি কাজকে দ্রুত করে দেওয়ার জন্য প্রদত্ত উপহার তথা ‘স্পিড মানি’। অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য দ্বারা ঘুষ-দুর্নীতি সম্পর্কে সরকারের নীতি ও মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে।
ঘুষ-দুর্নীতির উদ্ভব প্রাচীন যুগে। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে উত্তরণের প্রক্রিয়াকালে ঘুষ-দুর্নীতির উদ্ভব। প্রাচীন ইতিহাস-কাব্য-মহাকাব্যে-লোককাহিনিতে আমরা ঘুষ-দুর্নীতির বিবরণ খুঁজে পাই। এসব কারণে অনেকে বলে থাকেন, ঘুষ-দুর্নীতি হলো আদিকালের ব্যারাম। সমাজ যতদিন থাকবে, সমাজে এর কমবেশি অস্তিত্বও থাকবে। সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করার চিন্তা নিছকই একটি ‘ইউটোপিয়া’ তথা কল্পস্বর্গ রচনার মতো অবাস্তব-অসম্ভব কাজ। সে কারণে যা করার চেষ্টাটি সম্ভব ও বাস্তবসম্মত তা হলো দুর্নীতির ‘অপসারণ’ নয়, বরং তাকে ‘সহনীয়’ পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ ঘুষ-দুর্নীতি সঙ্গে নিয়েই মানবসমাজকে অনন্তকাল চলতে হবে। প্রশ্নটি হলো কেবল তাকে ‘অসহনীয়’ মাত্রায় পৌঁছাতে না দেওয়ার।
ঘুষ-দুর্নীতিকে ‘সমাজের একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য’ বলে কোনোক্রমেই স্বীকার করা যায় না! কেন? এ প্রশ্নের জবাবের জন্য সবচেয়ে আগে বুঝতে হবে, ‘সমাজ’ আসলে কী? এ কথা সবারই জানা যে, মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। মানব প্রজাতির উদ্ভবের ইতিহাসের লগ্ন থেকেই, মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে তার সামাজিক সত্তার আবশ্যিক সম্পৃক্ততা একটি অলঙ্ঘনীয় সত্য। ‘সমাজবদ্ধ’ হয়ে ওঠার সঙ্গে ‘মানব প্রজাতির’ উদ্ভব ও বিকাশ এবং মানবসভ্যতার অগ্রগতি ওতপ্রোতভাবে ও শর্তবদ্ধভাবে সম্পর্কিত।
মানুষের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনেই ‘সমাজ’ রচিত ও স্থাপিত হয়েছে। ‘মানবসমাজ’ মানেই হলো সম-স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মানুষের যৌথতা। যৌথ স্বার্থ ও যৌথতার বোধ হলো সমাজ গঠনের মৌলিক ও প্রাথমিক ভিত্তি। সব মানুষের একটি ব্যক্তিগত সত্তা থাকে। তেমনই অপরিহার্যভাবে তার থাকে একটি সামাজিক সত্তাও। যদি একজন মানুষ কেবল ব্যক্তি সত্তাসম্পন্ন হতো তা হলে তার সমাজবদ্ধ হওয়ার কোনোই আবশ্যিকতা থাকত না। যৌথতাভিত্তিক সামাজিক সত্তা থাকার কারণেই মানুষ ‘আপন অস্তিত্বের প্রয়োজনে’ সমাজবদ্ধ হয়েছে।
জন্মলগ্ন থেকে মানবসমাজ একটি অখ- ও অবারিতভাবে বহমান বাস্তবতা হওয়া সত্ত্বেও তার রূপ ও বৈশিষ্ট্যে পর্যায়ক্রমিক নানা রূপান্তর ঘটেছে। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে পর্যায়ক্রমে দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ ইত্যাদি হিসেবে তা রূপ লাভ করেছে। দাস সমাজে মানুষের মধ্যে শ্রেণিবিভাজনের যে সূত্রপাত, তা আজ অবধি অব্যাহত আছে। সমাজে শ্রেণিবিভাজন ও উৎপাদনের উপকরণগুলোর ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার কারণে মানুষের ‘সামাজিক স্বার্থ-সত্তার’ সঙ্গে তার ‘ব্যক্তি স্বার্থ-সত্তার’ সামঞ্জস্য ও সংগতিসম্পন্নতা বিনষ্ট হয়েছে। ফলে এই দুয়ের মধ্যে আজ দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যের উপাদান জন্ম নিয়েছে।
শ্রেণিবিভাজন ও উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা সমাজের কোনো অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য নয়। মানবসমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তনের কোনো এক স্তরে এসবের উদ্ভব হয়েছিল। তাই শ্রেণিবিভাজন ও ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থাকে সমাজ থেকে অপসারণ করতে পারলে, ‘যৌথ’ ও ‘ব্যক্তির’ মধ্যে যে বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে আছে তা নিরসনের ভিত্তি রচিত হবে। সে কারণে এ কথা বলা যায় যে, সমাজের সে ধরনের মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে পারলে ঘুষ-দুর্নীতিসহ অনেক ব্যাধি থেকেই মানবসভ্যতাকে মুক্ত করা যাবে।
বাস্তবজীবনে আমরা হরদম নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হই। এসব সমস্যা দু’ধরনের হতে পারে। কতগুলো সমস্যার উদ্ভব হয় ‘ব্যবস্থা’ ঠিকমতো কাজ না করার কারণে। ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়া বা তার পরিচালনায় অদক্ষতা-ত্রুটির জন্য যেসব সমস্যার উদ্ভব, সেই ব্যবস্থাকে গতিশীল করে তাকে দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারলেই সেসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু অন্য আরেক ধরনের কিছু সমস্যা আছে যেগুলো ‘ব্যবস্থাগত’ (systemic) সমস্যা। এসব সমস্যা বা রোগের উদ্ভব হয় ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের উৎস থেকে। ব্যবস্থার উন্নত পরিচালনার সাহায্যে এসব রোগ দূর করা যায় না। এসব রোগ দূর করার জন্য ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে রূপান্তর করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাধি অতি পুরনো। তবে আমাদের দেশে ব্রিটিশ শাসনামলে তাতে নতুন মাত্রিকতা যুক্ত হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ঘুষ-দুর্নীতিকে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি হাতিয়াররূপে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। শাসনযন্ত্রের তৃণমূল স্তর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত তারা তার প্রসার ঘটিয়েছিল। এভাবে ঘুষ-দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় কর্মপরিচালনার একটি উপাদান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল। অবশ্য ঘুষ-দুর্নীতির কর্মকা- যেন লাগামহীন পর্যায়ে গিয়ে চরম নৈরাজ্যমূলক না হয়ে উঠতে পারে সে জন্য সেই ব্রিটিশরাই আবার ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন, বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থাও প্রবর্তন করেছিল। অবশ্য সে ক্ষেত্রে আবার বিত্তবানরা যেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে তার ব্যবস্থাও তারা রেখেছিল। ব্রিটিশ শাসকদের প্রবর্তিত ঘুষ-দুর্নীতির সেই ধারা আমাদের দেশে অব্যাহত থেকেছে। বর্তমানে বাজার-অর্থনীতির অভিঘাত সমাজে ঘুষ-দুর্নীতির মাত্রা ও প্রকারের বিস্তৃতিকে গুণগত নতুন মাত্রিকতায় নিয়ে গেছে।
আমাদের দেশে বর্তমানে ঘুষ-দুর্নীতি যে ভয়াবহ প্রসার ও মাত্রা অর্জন করেছে তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে এ কথা বুঝতে হবে যে, ঘুষ-দুর্নীতির বর্তমান ভয়াবহতার ব্যাপারটি হলো প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার একটি অভিঃপ্রকাশ মাত্র। এমতাবস্থায় ঘুষ-দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে হলে শুধু অভিঃপ্রকাশগুলো (অর্থাৎ শুধু ঘুষ-দুর্নীতির বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি) দূর করলেই চলবে না। অপরদিকে শুধু অভিঃপ্রকাশের উৎস (অর্থাৎ শুধু প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে) উচ্ছেদ করার কাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও চলবে না। আসলে এই দুটোর ক্ষেত্রেই একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিতে আলাদাভাবে সফলতা আনা যাবে না। দুটো কাজকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। অভিঃপ্রকাশের ঘটনাবলি রুখে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার আর্থ-সামাজিক উৎসকেও আঘাত করতে হবে। এবং সেই উৎস উৎপাটন করে এমন একটি বিকল্প আর্থ-সামাজিক ভিত্তি সৃষ্টি করতে হবে, যা সহজাতভাবে ঘুষ-দুর্নীতির লালনকারী নয়। সে ব্যবস্থা হলো ‘সমাজতন্ত্র’।
সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ প্রভৃতি সংস্থা দ্বারা আমাদের দেশ আজ বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত। তারা যে অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শন ও চলার পথ নির্দেশ করে দিয়েছে সেটিই অনেকাংশে জন্ম দিয়েছে লুটেরা ও পরগাছাপরায়ণ লুটপাটের অর্থনীতি। এই নীতি-দর্শন অনুযায়ী দেশের অগ্রগতির (?) জন্য ব্যক্তিগত মালিকানায় দ্রুতগতিতে বিপুল পুঁজি সঞ্চয় হওয়াটি জরুরি। স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য দিয়ে (মুনাফার হার যদি ২৫ শতাংশও ধরি) একজন লাখপতিকে কোটিপতি হতে ২০-২৫ বছর সময় লাগবে, অথচ সে দু-এক বছরেই কোটিপতি হতে চায়। সে জন্য পথ রয়েছে একটিই। তা হলো, হয় অস্বাভাবিক হারে ‘মুনাফা’ করতে হবে কিংবা আইনি পথের বাইরে গিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হবে। তা না হলে ব্যক্তিগত মালিকানায় পুঁজি সঞ্চয় হবে না। রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যাবে না। লুটপাটের জন্য এই তাগিদই ঘুষ-দুর্নীতিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে লালন করছে।
এ দেশে গড়ে উঠেছে একশ্রেণির লুটেরা বিত্তবান। তারাই এখন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। তাদের লুটপাট নিরাপদ রাখার জন্যই তারা আমলাতন্ত্র, একশ্রেণির রাজনীতিবিদ, মাস্তান বাহিনী প্রভৃতিকে লুটপাটের ভাগীদার বানিয়ে দেশকে (সরকার, বিরোধী দল, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি প্রভৃতি সবকিছু) নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশ আজ এক অশুভ ‘মাফিয়া সিন্ডিকেটে’র হাতে বন্দি। সমাজ-দর্শন ও সমাজ-কাঠামোতে এই লুটপাটের ব্যবস্থা ও ধারা অব্যাহত থাকার কারণেই ‘সরকার আসে যায়, কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতি চলছে তো চলছেই।’
একই কারণে এ দেশে এখনো উৎপাদনমুখী উদ্যোগে উত্তরণ এবং ন্যূনতম অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না। ফটকাবাজি-চোরাচালান-মজুদদারি প্রভৃতি ক্ষেত্রে মুনাফা হয় বিপুল এবং রাতারাতি। কিন্তু শিল্পে বিনিয়োগে খাটুনি বেশি, মুনাফা জমা হওয়ার প্রক্রিয়াও দীর্ঘমেয়াদি। তা ছাড়া ‘অবাধ বাণিজ্য’ নীতি দেশকে বিদেশি পণ্যের নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে পরিণত করেছে। ফলে অর্থনীতির নিয়মানুসারেই দেশের নবীন শিল্প-উদ্যোগ ‘অবাধ প্রতিযোগিতার’ গলাকাটা প্রক্রিয়ায় উন্নত বিদেশি কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। এসব কারণে শিল্প পুঁজির তুলনায় ব্যবসায়ী পুঁজি (যা মূলত বিদেশি কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টের কাজ করে চলেছে) তার আধিপত্য বজায় রেখে অর্থনীতির উৎপাদনবিমুখ, পরগাছাপরায়ণ ও লুটেরা চরিত্র জিইয়ে রাখছে। এগুলোই হলো এ দেশের ঘুষ-দুর্নীতির ভয়াবহতার উৎসসূত্র। ‘ঘুষ-দুর্নীতি উন্নয়নবিরোধী ধারার উৎস’ - এই বক্তব্য যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য হলো, ‘উন্নয়নবিরোধী প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা হলো ঘুষ-দুর্নীতির জন্মদাতা।’
তা হলে এখন মূল কথায় ফিরে এসে বলা যায়, বর্তমানে যে সমাজ-দর্শন ও অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ধারায় দেশ চলছে, ঘুষ-দুর্নীতির ভয়াবহতার অবসানের জন্য সেই ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ একান্ত অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইন-কানুন প্রণয়ন, আরও কঠোরভাবে ঘুষ-দুর্নীতি মোকাবিলা করা ইত্যাদি প্রয়োজন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যার প্রয়োজন তা হলো, ঘুষ-দুর্নীতির লালনকারী বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন। ঘুষ-দুর্নীতি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে আসল জায়গায় আঘাত করতে হবে। যে ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’ সর্বগ্রাসী সর্বব্যাপী এক মহাশক্তিরূপে সব সরকারের আমলেই ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে আছে, তাকে সম্পূর্ণ পরাস্ত ও নির্মূল করতে হবে। সেই সুস্পষ্ট লক্ষ্যে বেগবান করতে হবে গণসংগ্রামের ধারা। গড়ে তুলতে হবে জাতীয় জাগরণ। নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সংগঠিত করতে হবে এক জাতীয় নব-উত্থান। তাহলেই কেবল ঘুষ-দুর্নীতি থেকে পরিত্রাণের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য নয়, কমানোর জন্য গণশুনানীর আহ্বান

 ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বিকেল ৪:৩০ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারার প্রতিবাদে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘কিছুদিনের মধ্যে প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুতের দাম ৩০ থেকে ৩৫ পয়সা বাড়তে পারে। তবে সরকার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দিলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।’ মন্ত্রীর এহেন বক্তব্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা পিডিবি কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান না, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ফলে পিডিবি কেন তেল আমদানী করবে? মন্ত্রীর এ প্রস্তাবে দুর্নীতি-লুটপাটের আরেকটি খাত যুক্ত হবে। সভায় বলা হয়, বিপিসি যে দামে তেল আমদানী করবে তার উপর আমদানী শুল্ক, ভ্যাট, ট্যাক্স ইত্যাদি বাদ দিয়ে পিডিবিকে সরবরাহ করলেই তো দাম বাড়ানোর কোন প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যথেষ্ঠ কমলেও দেশে কমানো হচ্ছে না। সমাবেশে বক্তবাগণ বলেন, সরকার বলছে বিদ্যুৎ খাত ৩৮১৬ কোটি টাকা ঘাটতিতে আছে। তা পূরণ করার জন্য মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বর্তমান রেট থেকে ২৫ পয়সা মূল্য বাড়ানো হলে সরকার পাবে প্রায় ১৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু মাত্র ফার্নেস ওয়েলের মূল সমন্বয় করা, সিস্টেম লস, পরিচালনা ব্যয় ও কুইক রেন্টাল তেল না দিয়ে গ্যাস দিয়ে উৎপাদন করলে বর্তমান অবস্থায় ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিইআরসি গণশুনানী করার কথা। কিন্তু এর আগেও কয়েকবার শুনানীর পর দেশের সকল মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারীভাবে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। তাহলে জনগণের মতামত যদি আমলে না নেয়া হয় তবে গণশুনানীর এই নাটক কেন বিইআরসি করে। তাই দাম বৃদ্ধি নয়, বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য গণশুনানী করা প্রয়োজন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমছে। বিইআরসি দাম কমানোর জন্য গণশুনানী না করলে প্রতিবারের মতোই এ গণশুনানী গণপ্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে। বক্তাগণ বলেন, সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট ও রাজনৈতিক অভিলাশ বাস্তবায়ন করার জন্য দাম বাড়িয়ে জনগণের ভোগান্তি কোনভাবেই সহ্য করা হবে না। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা বন্ধ করা না হলে ঘেরাও-হরতালসহ যেকোন কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ঢাকা নগর শাখার আহ্বায়ক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, বাসদ ঢাকা নগর কমিটির সদস্য সচিব জুলফিকার আলী, খালেকুজ্জামান লিপন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন, প্রকৌশলী শম্পা বসু প্রমুখ। সমাবেশে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সিপিবির কেন্দ্রীয় অন্যতম সম্পাদক রুহীন হোসেন প্রিন্স, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বাম মোর্চার নেতা আকবার খান। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে হাইকোর্ট মোড় ঘুরে, তোপখানা রোড, পুরানা পল্টন, দৈনিক বাংলা, বায়তুল মোকাররম হয়ে তোপখানা রোডে এসে শেষ হয়।

‘বিপ্লব গোলাপ ছড়ানো বিছানা নয়’

কমরেড ফিডেল ক্যাস্ট্রো
================
নানা ষড়যন্ত্র, বিদেশি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ৫০ বছরের বেশি কিউবা শাসন করে ইতিহাসে অমর হয়ে রইলেন বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় বাণী উচ্চারণ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম একটি বাণী হলো- বিপ্লব কোনো গোলাপ ছড়ানো ফুলের বিছানা নয়।
বিপ্লব হলো ভবিষ্যৎ ও অতীতের মধ্যে লড়াইয়ের নাম (এ রেভ্যুলুশন ইজ নট এ বেড অব রোজেজ। এ রেভ্যুলুশন ইজ এ স্ট্রাগল বিটুইন দ্য ফিউচার অ্যান্ড দ্য পাস্ট)। এখানে বিভিন্ন সময়ে তার করা বিখ্যাত কিছু উক্তি তুলে ধরা হলো: ১৯৫৩ সালে কিউবার সান্তিয়াগোতে মোনকাডা সামরিক ব্যারাকে প্রায় আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে বিচারে তখনকার তরুণ আইনজীবী ফিদেল ক্যাস্ত্রো আদালতে বলেন, আমি আমার নিন্দা জানাই। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নই। আমাকে বিচারকরবে ইতিহাস।
১৯৫৯ সালে তিনি বলেন, ৮২ জন সদস্যকে নিয়ে আমি বিপ্লব শুরু করেছিলাম। আমি যদি আবার সেটা করতে পারতাম তাহলে আমি শুধু ১০ জন বা ১৫ জন অথবা শুধু বিশ্বাসকে বুকে নিয়ে করতে পারতাম। আপনার যদি বিশ্বাস ও একশন পরিকল্পনা থাকে তাহলে আপনি কতটা ক্ষুদ্র সেটা কোনো বিষয় নয়।
বিপ্লবের ৩০ দিন পরে ১৯৫৯ সালে সিবিএসের অ্যাডওয়ার্ড মারো’কে একটি সাক্ষাৎকার দেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো। তিনি এ সময় বলেন, আমি দাড়ি কাটার কথা ভাবছি না। কারণ আমি দাড়িতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এই দাড়ি আমার দেশের জন্য অনেক অর্থ বহন করে। যখন আমি দেশে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পূর্ণ করতে পারবো তখনই তা কেটে ফেলবো।
১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি ঘোষণা দেন, সিগারেট পান করা ছেড়ে দিয়েছেন। এ ঘোষণায় তিনি বলেন, এটা যে করবো তা অনেক আগেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিউবার জনগণের স্বাস্থ্যের জন্য ধূমপান নিষিদ্ধ করতে আমাকে এই ত্যাগটি করতে হতো। সত্যিকার অর্থেই সিগারেটের কথা এখন আমার আর অত মনেই হয় না।
১৯৮৫ সালে তিনি বলেন, যদি সমাজতন্ত্রী সম্প্রদায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় তাহলে একবার ভাবুন তো পৃথিবীতে কি ঘটবে। যদি এটা সম্ভব হয় তবু আমি বিশ্বাস করবো না (সমাজতন্ত্রী সম্প্রদায়ের বিনাশ ঘটবে)।
কিউবায় আন্তর্জাতিক পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে ১৯৯০ সালে তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমরা ভদ্র মানুষ। আমরা সত্য বলতে জানি। বিনিময়েকারো কাছ থেকে অর্থ নেয়ার কথা ভাবিও না।
১৯৯২ সালে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে জেল খাটেন ভেনিজুয়েলার নেতা হুগো শাভেজ। তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। সোজা হাভানা সফরে চলে যান। এসময় তাকে যে অভ্যর্থনা দেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো তা আসলে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য বরাদ্দ থাকে। ওই সময় ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, এমন কাজে (অভ্যর্থনায়) কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। এমন অনেক ব্যক্তিকে স্বাগত জানানোর মতো অনেক সুযোগ যদি আমি পেতাম! এ ঘটনার পাঁচ বছর পরে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ফিদেল ক্যাস্ত্রোর ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হন।
২০০৩ সালে ‘কমান্ডেন্ট’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেনপরিচালক অলিভার স্টোন। এ সময় তাকে উদ্দেশ্য করে ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেন, বিপ্লবের অন্যতম বৃহৎ সুবিধাগুলোর অন্যতম হলোআমাদের পতিতারা পর্যন্ত কলেজ গ্রাজুয়েট। ২০০৫ সালে তিনি বলেন, অনেক বছর পর এখন আমি শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। আমরা হয়তো অনেকভুল করেছি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল হলো আমরা কাউকে বেশি বিশ্বাস করেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমরা জেনেছি কিভাবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আমরা মনে করি এটাই হলো ফর্মুলা। আর্জেন্টিনায় ২০০৬ সালে লাতিন আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের এক সম্মেলন ডাকা হয়। তাতে যোগ দিয়ে ২১শে জুলাই ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, আমি ৮০ বছর বয়সে পৌঁছতে পেরে আসলেই খুশি। আমি এমনটা কখনো আশাও করিনি। এমন একজন প্রতিবেশীও চাইনি যে বিশ্বের সবচেয়েবড় শক্তিধর, তারা আমাকে প্রতিটি দিন হত্যার চেষ্টা করছে।

খাল কেটে কুমির আনা হচ্ছে


লেখকঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতিঃ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষানীতি নিয়ে খোলামেলা কথাবার্তা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আমাদের দেশে সেভাবে হয় না বললেই চলে। দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ দেশের সম্পর্ক নিয়েও খোলামেলা আলোচনার ক্ষেত্রেও রাখঢাক করে চলার প্রবণতা মজ্জাগত হয়ে আছে। এমনকি পার্লামেন্টেও এসব বিষয় নিয়ে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতাসম্পন্ন আলোচনা তেমন একটা হয় না। কেবল বাজেট অধিবেশনে, নিছক আইন রক্ষার জন্য যেটুকু আনুষ্ঠানিক আলোচনা না করলেই নয়, সেটুকুই শুধু করা হয়ে থাকে।
এ রকম হওয়াটার পক্ষে যুক্তি হিসেবে সাধারণত বলা হয়ে থাকে, প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমেরিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে সে দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়েই শুধু নয়, তাদের নেওয়া বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও খোলামেলা উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্ক হরহামেশাই হচ্ছে। ‘স্পর্শকাতরতার’ কারণে সে তর্ক-বিতর্ক বন্ধ করে রাখা হয় না।
এ কথা হয়তো ঠিক যে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির অনেক বিষয় ‘স্পর্শকাতর’ বিধায় তার সবকিছু নিয়ে জনগণের মাঝে একেবারে ষোলোআনা খোলামেলা আলোচনায় অসুবিধা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের বা পার্লামেন্টারি কমিটির রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনায় অসুবিধা থাকার তো কোনো কারণ থাকতে পারে না। পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যে তো নিশ্চয়ই বিদেশের চর নেই। সে রকম থাকলে তো সে এক ভয়ঙ্কর বিপদের কথা! এসব কথা বাদ দিলেও এ কথা অন্তত নিশ্চিত বলা যায় যে, একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিভাগের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনার নিয়ম-নীতি কী হওয়া বাঞ্ছনীয়, নিদেনপক্ষে সে বিষয় নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনায় কোনো অসুবিধা থাকার কারণ তো একেবারেই থাকতে পারে না।
দেশের সংবিধানে বিদেশের সঙ্গে গোপনে কোনো চুক্তি করার সুযোগ রাখা হয়নি। সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন; তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হইবে।’
সংবিধানে এরূপ স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সে নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করে বিদেশের সঙ্গে নানা চুক্তি, বিশেষত প্রতিরক্ষাবিষয়ক, গোয়েন্দা তৎপরতাবিষয়ক, সামরিক জোটে যোগদানবিষয়ক চুক্তি সম্পাদন করা ও এসব বিষয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে কোন আইন ও অধিকারবলে?
গত ২৫ আগস্ট সৌদি আরবের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল আইশ তার ঢাকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কথা হয়েছে। সৌদি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী সেই সৌদি আহ্বানে সাড়া দেবেন বলে জানিয়েছেন। সৌদি আরবকে বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুরাষ্ট্র উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে সৌদি আরব একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।’ জানতে ইচ্ছে করছে, এরূপ অভিমত প্রকাশের সময় কি প্রধানমন্ত্রীর মনে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে সৌদি আরবের ভূমিকার কথা একবারও উদয় হয়নি?
১-২ মাস আগে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পেরেছিল, সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোটের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ধরনের সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ভালো-মন্দ বিচার করার আগে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবে বিস্ময় জাগায় তা হলো, কোনো সামরিক জোটে যোগদানের মতো এরকম একটি গুরুতর বিষয়ে দেশে কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই এবং এমনকি সে সম্পর্কে ন্যূনতম আভাস-ইঙ্গিত ছাড়াই, এত সংগোপনে এরূপ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেল কেন ও কীভাবে? সামরিক জোটে যোগদান করাটি কোনোভাবেই হালকা কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ আগাগোড়াই একটি জোটনিরপেক্ষ দেশ। বিশ্বের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সমর্থন নিয়ে এ দেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হতে পেরেছিল। পাকিস্তান আমলে জোটনিরপেক্ষতার নীতির সপক্ষে বহু সংগ্রাম হয়েছিল। স্বাধীনতার পর স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ থাকবে। ৪৫ বছর ধরে সেই অঙ্গীকার বজায় রেখে বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষতার একটি সুদৃঢ় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে। কাউকে না জানিয়ে সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে সংগোপনে পরিত্যাগ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক জোট গঠনের অধিকার সরকারকে কে দিল?
মধ্যপ্রাচ্যে এখন সৌদি আরব ও ইরানকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী দুটি শিবির দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত। বিভিন্ন দেশে তারা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ পরিচালনা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের এরূপ জটিল সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে কোনো একটি শিবিরে অবস্থান নেওয়াটি কি তার জাতীয় স্বার্থে অনুকূল হয়েছে? নাকি তার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আগুন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার বিপদ সৃষ্টি হলো? সেই সৌদি আরব ইয়েমেনে আগ্রাসন ও গণহত্যা চালাচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে তার মিতালির খবর এখন প্রকাশ হয়ে পড়েছে। এই সৌদি আবরই তালেবান, আল কায়েদা, আইএস ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক ‘টেররিস্ট’ বাহিনী গঠনে অর্থ-অস্ত্র সরবরাহ ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রমূলক পথে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক-রণনৈতিক পরিকল্পনার প্রধান বরকন্দাজের ভূমিকায় নিয়োজিত।
সৌদি আরব একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুধু বিরোধিতাই করেনি, পাকিস্তান ও তার হানাদার বাহিনীকে সে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে মদদ দিয়েছিল। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত ইত্যাদিকে সে ক্রমাগত উসকে দিয়েছিল। এখনো সে কাজে সে লিপ্ত রয়েছে। জামায়াত-শিবির, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম প্রভৃতি উগ্র সাম্প্রদায়িক দল ও ‘টেররিস্ট’ বাহিনীর প্রধান অর্থ জোগানের কাজ যে সৌদি আরব থেকেই হচ্ছে সে কথা বহু দিন থেকেই ওপেন সিক্রেট। সেই সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক জোট গঠন করাটি কি ‘খাল কেটে কুমির আনার’ মতো আত্মঘাতী পদক্ষেপ নয়? এ পথে যাওয়াটা সরকারের উচিত হয়েছে কি? কিংবা সে পথে যাওয়ার অধিকার সে রাখে কি? সৌদি আরবের অর্থে কেনা অস্ত্র-গুলি-বোমায় যে ৩০ লাখ মানুষ একাত্তরে শহীদ হয়েছিলেন, সৌদি নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোটে যোগদান কি তাদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার মতো কাজ নয়? সে কথা কি সরকারের মনে একবারও উদয় হয়নি?
সৌদি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঢাকা সফরের ৪ দিন যেতে না যেতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) জন কেরি ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ১০ ঘণ্টার এক ঝটিকা সফর করে গেলেন। দু’দিনের ভারত সফরের পথে ক্ষণিকের যাত্রাবিরতির মতো এ সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে গেছেন। তার ঢাকায় পা রাখার আগেই ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করে দু’দেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ যেন বিশ্বে স্ট্র্র্যাটেজিক ভূমিকা পালন করতে পারে, সেই বার্তা ঢাকাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জন কেরি ঢাকায় আসছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ের পাশাপাশি গণতন্ত্র, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার বিষয়ের ওপরও জন কেরি জোর দেবেন। পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ও কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে এসব বিষয়ে জন কেরির কী কথা হয়েছে তার সবকিছু জানার সুযোগ আমাদের নেই। হয়তো অনেক ‘স্পর্শকাতর’ বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে। মিডিয়া ব্রিফিংয়ে যতটুকু তারা জানতে পেরেছে কেবল সেটুকুই আমরা জানতে পেরেছি।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে থাকবে ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেবে বলে জানানো হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ সহায়তার কতটা সামরিক চরিত্রের হবে, সে কথা অবশ্য জানানো হয়নি। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক জোটে যোগদান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত সামরিক ‘সহায়তা’ দেশকে বিশ্ব রাজনীতির সেই অক্ষশক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের দেশ স্বাধীন করতে হয়েছিল। যুক্তি দেওয়া হতে পারে যে, একাত্তরের বিশ্বপরিস্থিতি তো এখন আর নেই। কিন্তু কথা হলো, তা না থাকার অর্থ কি এই যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের চরিত্র অর্জন করেছিল তা পরিত্যাগ করতে হবে? যদি তাই করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার কথা বলে জনগণকে প্রতারিত করার কী অর্থ থাকতে পারে?
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়াটি চূড়ান্ত বিচারে হলো চরম আত্মঘাতী। তালেবান, আল কায়েদা, আইএস ইত্যাদি সন্ত্রাসী জঙ্গি বাহিনী সৃষ্টির পেছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল তা এখন সর্বজনবিদিত। এসব জঙ্গিবাদী অপশক্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হলোÑ ‘সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো।’ জন কেরির সফরের আসল লক্ষ্য কী ছিল সে সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হয় যদি আমরা তার দু’দিনের ভারত সফরের ফলাফলের প্রতি দৃষ্টি দিই। ভারত সফরকালে জন কেরি গুরুত্বের সঙ্গে ‘দক্ষিণ চিন সাগরে শান্তি রক্ষায়’ ভারতের বর্ধিত ভূমিকার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে উভয় দেশ পরস্পরের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে এই মর্মে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। ‘চিনকে ঠেকাও’ যে জন কেরির দক্ষিণ এশিয়া সফরের মূল লক্ষ্য ছিল সে কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
বাংলাদেশকে ‘গণচিনবিরোধী’ মেরুকরণে শামিল করার লক্ষ্য থেকে জন কেরি মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা সম্পর্কে পিঠ চাপড়ানো কিছু কথাবার্তা বলেছেন। তাতে আওয়ামী শিবিরে আহাদের শেষ নেই। কিন্তু জন কেরির কথার গূঢ় অর্থ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের দর্শনার্থী বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘... এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে তারই কন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে...।’ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ হলো সমাজতন্ত্র, জোটনিরপেক্ষতা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, ‘দরকার হলে ১০০ বছর ঘাস খেয়ে থাকব তবুও শর্তযুক্ত ঋণ নেব না’, ‘বিশ্ব আজ শোষক ও শোষিত এই দুই ভাগে বিভক্ত, আমি শোষিতের পক্ষে’ ইত্যাদি। এ দেশ যখন এই পথ ধরে চলছিল তখন যুক্তরাষ্ট্র তা থেকে দেশকে বিচ্যুত করতে মরিয়া হয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে অনেক কথা রয়েছে। তাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া বঙ্গবন্ধুর দ-প্রাপ্ত আসামিকে এ দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধটিকে জন কেরি ধামাচাপা দেওয়ার পথ নিয়েছেন।
তবে এ ক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে গুরুতর বিষয় তা হলো, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ’ বলে জন কেরি যে পথটিকে সার্টিফিকেট দিয়ে গেলেন তা প্রকৃতপক্ষে হলো ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথের’ সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। এখন দেশ যে পথ ধরে চলছে তা হলো সমাজতন্ত্রের বদলে বাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের কাছে আত্মসমর্পণ, জোটনিরপেক্ষতার বদলে সৌদি নেতৃত্বে সামরিক জোটে যোগদান, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার বদলে সাম্রাজ্যবাদের পদলেহন, বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর বদলে শোষকদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ ইত্যাদি। জন কেরির কথায় এটিই নাকি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ। যদি তাই হবে তবে মোশতাক, জিয়া, এরশাদের পথ কোনটাকে বলব? ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথের’ চরিত্রকেও যুক্তরাষ্ট্রীয়করণ করে তার বিপরীত ধারার পথকে সে জায়গায় প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা তিনি করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই তাদের কাজ শেষ হয়নি। তারা এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথের প্রকৃত মর্মকথাকেও হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব দৃঢ়তর হওয়ায় যারা আজ আহাদে আত্মহারা তাদের এ কথাটি মনে রাখা উচিত যে, ‘আমেরিকা যার বন্ধু, তার আর কোনো শত্রুর প্রয়োজন হয় না।’
আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এমন ডিগবাজি দেওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছিল। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর ‘৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হয়ে গেছে’ বলে ঘোষণা দিয়ে পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরিত্যাগ করেছিলেন এবং ‘জিরো প্লাস জিরো ইজ ইকুয়াল টু জিরো’ তত্ত্ব দিয়ে জোটনিরপেক্ষতার নীতির কবর দিয়ে সেন্টো, সিয়াটো, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি ইত্যাদি সামরিক জোটে দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আওয়ামী লীগ এখন কতটা ‘সোহরাওয়ার্দীপন্থি’ আর কতটা ‘বঙ্গবন্ধুপন্থি’ সে প্রশ্নের জবাব খুঁজে দেখার চেষ্টা সংশ্লিষ্ট সবারই করা উচিত নয় কি?
প্রকাশ : (০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬)